মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৮:১২ অপরাহ্ন

ঘোষনা :
  সম্পূর্ণ আইন বিষয়ক  দেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকা   দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল এর  পক্ষ থেকে সবাইকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা   । 
সংবাদ শিরোনাম :
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে কিভাবে জামিন নিবেন কুষ্টিয়াস্থ খোকসা ওয়েলফেয়ার এ্যাসোসিয়েশনের অফিস উদ্বোধন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত মত প্রকাশের স্বাধীনতা, আদালত অবমাননা, শাস্তি ও বাস্তবতা! জমি, বাড়ী, ফ্ল্যাট হতে কেউ দখলচ্যূত হলে কি করবেন? জমি-জমা নিয়ে যে কোন ধরণের বিরোধ দেখা দিলে কি করবেন? জমি অধিগ্রহণ কি, কেন, কখন, কিভাবে? নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু আইনে প্রথম রায়ঃ অনুকরণীয়, অনুসরণীয় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা না করার আদেশ বনাম আইন ও সংবিধান! নাবালক সন্তান উদ্ধার কিংবা অভিভাবকত্ব নির্ধারণ করবেন কিভাবে? স্বামী বা স্ত্রীর পরকীয়ার ভয়ঙ্কর পরিণতি ও আইনী প্রতিকার!


সন্যাসী থেকে রাজা

সন্যাসী থেকে রাজা

প্রতিকী ছবি

 

বিনোদ কুমার আগারওয়াল: ছোট বেলায় আমরা সবাই অনেক রূপকথার গল্প শুনেছি, কিন্তু আজ যা বর্ণনা করবো তা রূপ কথাকেও হার মানায়। ঢাকার নিকটবর্তী গাজীপুর জেলার অন্তর্গত প্রাচীন ভাওয়াল পরগণার জমিদার ছিলেন রাজা কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী। তাঁর পিতার নাম গোলক নারায়ণ রায় চৌধুরী এবং মাতা লক্ষী প্রিয়া দেবী। ঢাকার কারওয়ান বাজার, মগবাজার, তেজগাঁও এলাকাসহ ঢাকা শহরের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাঁর জমিদারীর অধীনে ছিল। কালী নারায়ণ সুদর্শন ও সুপুরুষ ছিলেন। ১৮৭৪ সালে ভারতের বড় লাট লর্ড নর্থব্রুক তাঁকে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বর্তমান জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হিসাবে ব্যবহৃত হ”েছ ভাওয়াল রাজ প্রাসাদ। প্রায় ১৫ একর সমতল ভূমির উপর এই প্রাসাদটি নির্মিত হয়েছে। ১৮৩৮ সালে কালী নারায়ণ রায় প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। ১৮৮৫ ও ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে প্রাসাদটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার পুত্র রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় তা সংস্কার করেন বলে জানা যায়। প্রাসাদে বিভিন্ন আয়তনের ৩৬০ টিরও বেশি কক্ষ আছে। সমগ্র রাজবাড়ীটি পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত ও সুরক্ষিত।
মৃত্যুকালে উত্তরাধিকারী হিসেবে তিন পুত্র সন্তান রেখে যান।
১। রণেন্দ্র নারায়ণ রায়,
২। রামেন্দ্র নারায়ণ রায় এবং
৩। রবীন্দ্র নারায়ণ রায়।
প্রত্যেকে সম্পত্তিতে সমান অংশে অংশীদার। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র কুমার রামেন্দ্র নারায়ণ রায় বিয়ে করেন বিভাবতী দেবীকে। তাদের কোন সন্তানাদি ছিল না। কুমার রামেন্দ্র নারায়ণ রায় অসু¯’তার কারণে ডাক্তারদের পরামর্শে ১৯০৯ সালের এপ্রিল মাসে সুচিকিৎসা ও হাওয়া বদলের জন্য স্ত্রী ও অন্যান্য আত্মীয়দের সাথে নিয়ে দার্জিলিং গমন করেন। সেখানে তিনি ৮ই মে, ১৯০৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে তাঁর স্ত্রী বিভাবতী দেবী ভাওয়াল রাজ্যের এক-তৃতীয়াংশের মালিক এবং দখল প্রাপ্ত হন। তিনি রাজ্য পরিচালনায় ও রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হলে ১৯১১ সালে ‘কোর্ট অব ওয়ার্ডস’ তাঁর পক্ষে রাজস্ব আদায়ের ভার নেয়।
১৯৩০ সালের ২৪শে এপ্রিল এক সন্যাসী নিজেকে রাজা রামেন্দ্র নারায়ণ রায় দাবী করে ঢাকায় প্রথম সাব অর্ডিনেট জজ আদালতে স্বত্ব মামলা নং ৭০/১৯৩০ দায়ের করেন যাহা অতিরিক্ত জেলা জজে বদলী অন্তে
নূতন নাম্বার হয় স্বত্ব মামলা নং ৩৫/১৯৩৫। উক্ত মোকাদ্দমায় ১নং বিবাদী করা হয় বিভাবতী দেবীকে। ২-৪ নং বিবাদী করা হয় রাজা রণেন্দ্র নারায়ণ এবং রবীন্দ্র নারায়ণ বিধবা স্ত্রীগণকে এবং জনৈক রাম নারায়ণকে, সে নিজেকে রাজা রবীন্দ্র নারায়ণের দত্তক পুত্র হিসেবে দাবী করেছিল।
সন্যাসীর মোকাদ্দমার আরজীর সংক্ষিপ্ত বিবরণ ছিল যে,
৮ই মে ১৯০৯ তারিখ রাতে তাঁকে চিকিৎসার ছলে বিষ প্রয়োগ করা হলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাঁকে মৃত ভেবে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়, কিš‘ তাঁকে চিতায় দাহ করার পূর্বেই প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে যারা তাঁর দেহ বয়ে শ্মশান নিয়ে গিয়েছিল তাঁরা দেহ রেখে নিজেদেরকে ঝড়-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করার জন্য অন্যত্র আশ্রয় নেয়। ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেলে তাঁরা এসে দেখে চিতার উপর রেখে যাওয়া রাজা রামেন্দ্র নারায়ণের দেহটি নেই। প্রকৃত পক্ষে, ঝড়-বৃষ্টির সময় প্রবল বৃষ্টিতে রাজার বিষক্রীয়া কিছুটা নষ্ট হয়ে গেলে তাঁর গোঙানীর শব্দে আগে থেকে শ্মশানে অব¯’ানকারী একদল নাগা-সন্যাসী তাঁকে চিতা থেকে উদ্ধার করে তাঁদের সাথে নিয়ে যায়।
চিতা থেকে উদ্ধার হলেও বিষক্রীয়ার কারণে রাজার অতীতের স্মৃতি লোপ পায়। রাজা সন্যাসী দলের একজন হয়ে ভারতের এক¯’ান থেকে অন্য¯’ানে সন্যাসী বেশে ঘুরতে ঘুরতে ১৯২১ সালে (কারও মতে ১৯২০ সালে) ঢাকায় আগমণ করে। সেখানে সে অনেকের দ্বারা রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায়ের দ্বিতীয় পুত্র কুমার রামেন্দ্র নারায়ণ রায় হিসেবে চিহ্নিত হয়। এরপর সন্যাসী ৪ঠা মে, ১৯২১ সালে নিজেকে কুমার রামেন্দ্র নারায়ণ রায় হিসেবে প্রকাশ করে। ভাওয়াল রাজ্যের অনেক প্রজারা তাঁকে রাজা হিসেবে মেনে নিয়ে রাজস্ব ও নজর প্রদান করতে থাকলে ৩রা জুন, ১৯২১ সালে ঢাকার কালেক্টর ‘কোর্ট অব ওয়ার্ডস’ এর প্রতিনিধি হিসেবে এবং বিভাবতী দেবী ও তাঁর ভ্রাতা সত্যেন্দ্র নাথ ব্যানার্জীর সাথে যোগ-সাজসের মাধ্যমে প্রজাদের মধ্যে এই মর্মে নোটিশ প্রদান করেন যে, তাঁরা যদি সন্যাসীকে রাজস্ব বা নজর প্রদান করে তবে তাঁর ফলাফলের জন্য তাঁরা দায়ী হবে। এই প্রেক্ষীতে সন্যাসী নিজেকে কুমার রামেন্দ্র নারায়ণ রায় হিসেবে ঘোষণা প্রদানের জন্য উপরোক্ত মোকাদ্দমা দায়ের করেন এবং একটি নিষেধাজ্ঞার প্রার্থনা করেন যে, বিভাবতী দেবী বা ‘কোর্ট অব ওয়ার্ডসের প্রতিনিধি যেন তাঁর এক-তৃতীয়াংশ ভাগে কোন হস্তক্ষেপ করতে না পারে। পরবর্তী সময়ে দখলী স্বত্ব ও খাস-দখলের প্রার্থনাও তাঁর আরর্জীতে সন্নিবেশিত করেন।
এবার আসা যাক অন্য বিষয়ে যে কিভাবে কুমার রামেন্দ্র নারায়ণ রায় প্রথম চিহ্নিত হলেন।
১৯২১ সালে ঢাকার বাকল্যান্ড বাঁধের কাছে সর্বাঙ্গে ছাইমাখা এক সন্যাসীর আগমণ ঘটে। গুজব রটে যায় যে, তিনিই ভাওয়ালের মেজো কুমার, তাঁকে দেখতে আসেন তাঁর ভাগ্নে বুদ্ধু কিš‘ তিনি তাঁর পরিচয় সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে পারেন নি। ঢাকায় যারা তাঁকে মেজো কুমার ভাবতে শুরু করে ছিলো তারা সন্যাসীকে হাতিতে করে ১৯২১ সালের ১২ই এপ্রিল জয়দেবপুরে পাঠিয়ে দেয়। তবে সন্যাসী ২৫ শে এপ্রিল আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। আত্মীয়দের অনুরোধে সন্যাসী আবার ৩০ শে এপ্রিল জয়দেবপুর ফিরে যান। জয়দেবপুরে উপ¯ি’ত জনতার জিজ্ঞাসাবাদে সন্যাসী প্রথমবারের মতো তাঁর দুধ-মার কথা মনে করতে পারেন। এই তথ্য পরিবারের বাইরে কারো জানা ছিল না বলে সবাই সন্যাসীকে কুমার রামেন্দ্র নারায়ণ বলে বিশ্বাস করে। কিš‘ মূলত তাঁর স্ত্রী বিভাবতী দেবী কুমারকে অস্বীকার করায় উপরোক্ত মামলার সূত্রপাত হয়।
ফিরে যাওয়া যাক মোকাদ্দমার বিষয়ে। বিচারক পান্না লাল বসু এই মামলার বিচারক ছিলেন। মি. বিজয় চন্দ্র চক্রবর্তী ভাওয়াল সন্যাসীর প্রধান উকিল ছিলেন অন্যদিকে বিভাবতী দেবীর পক্ষে উকিল ছিলেন মি. অমিয় নাথ চৌধুরী। মোকাদ্দমায় উভয়পক্ষের কয়েকশ সাক্ষী এই মোকাদ্দমায় সাক্ষ্য প্রদান করে। মোকাদ্দমা চলে তিন বৎসর। ১৯৩৩-১৯৩৬ সাল পর্যন্ত। সমস্ত সাক্ষী পর্যালোচনা করে বিচারক পান্না লাল বসু ১৯৩৬ সালে ২৪ শে আগস্ট তারিখে বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ সন্যাসীর পক্ষে রায় প্রদান করেন।
বিচারক পান্না লাল বসু তাঁর সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছিলেন ফরেনসিক রিপোর্টকে। তিনি উল্লেখ করেছিলেন কুমার রামেন্দ্র নারায়ণ রায় এবং সন্যাসীর মধ্যে অনেক সাদৃশ্য ছিল যেমনÑ
১। কুমারের গাত্র বর্ণ ছিলÑ গোলাপী ও শ্বেত, সন্যাসীর ছিলও তাই।
২। চুলের বর্ণÑ দু’জনারই হালকা বাদামী।
৩। উভয়ের চুলের ধরন ছিলÑ ঢেউ খেলানো।
৪। উভয়ের গোঁফ ছিল মাথার চুলের চাইতে পাতলা।
৫। দু’জনেরই চোখের বর্ণ ছিলÑ বাদামী।
৬। দু’জনেরই নীচের ঠোঁট ডানদিকে কুঞ্চিত।
৭। উভয়ের কানÑ কিনারার দিকে চোখা।
৮। কানের লতি গালের দিকে সংযুক্ত নয় এবং ছিদ্র যুক্ত।
৯। কন্ঠমনি ছিল উভয়ের প্রকট।
১০। উভয়েরই উপরের বাম মাড়ির দাঁত ছিল ভাঙ্গা।
১১। উভয়েরই হাত ছিল ছোট-ছোট।
১২। বাম হাতের তর্জনী ও মধ্যমা উভয়েরই ডান হাতের চাইতে কম অসম আকারের।
১৩। উভয়েরই পা খসখসে, জুতার নম্বর ছিল ৬।
১৪। ডান চোখের নীচের পাপড়িতে আঁচিল ছিল দু’জনারই।
১৫। উভয়েরই বাম গোড়ালির উপরের দিকে ক্ষত ছিল।
১৬। কুমারের ছিল সিফিলিস তবে সন্যাসীর সিফিলিস ছিল না, দাবী মতে সন্যাসীদের ঔষধে তা ভালো হয়ে যায়, কিš‘ ঘা এর দাগ ছিল।
১৭। উভয়েরই মাথা ও পিঠে ফোড়ার দাগ ছিল।
১৮। উভয়েরই কুঁচকীতে অস্ত্রোপচারের দাগ ছিল।
১৯। দু’জনারই ডান বাহুতে বাঘের থাবার আঘাত বিদ্যমান।
২০। উভয়েরই শিশ্নের নিম্ন ভাগে আঁচিল বিদ্যমান ছিল।
বিচারকার্য এখানেই থেমে থাকে নি। বিভাবতী দেবীসহ অন্যান্য কুমারের বিধবা স্ত্রীরা উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে আপীল নং- ১/১৯৩৭ দায়ের করেন। উক্ত আপীল তিনজন বিচারপতি সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চে শুনানী হয়। উক্ত শুনানী ১৪ই নভেম্বর ১৯৩৮ সাল থেকে শুরু হয়ে ১৪ই আগস্ট, ১৯৩৯ পর্যন্ত প্রতিদিন চলতে থাকে। মোট ১৬৪ কার্যাদিবস শুনানী লাগাতার চলতে থাকে। অবশেষে আপীলটি খারিজ করে কলকতা হাইকোর্ট। তারপরও বিভাবতী দেবী দমে যাননি। তিনি উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে লন্ডন¯’ীত প্রিভি কাউন্সিলে আপীল দায়ের করেন। ২৮ দিন ধরে শুনানী চলে। ১৯৪৬ সালের ৩০ শে জুলাই মহামান্য বিচারপতিগণ শুনানী অন্তে আপীল খারিজ বা নাকচ করে দেন।
কিš‘ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, প্রিভি কাউন্সিলের আপীলের রায়ের পরদিন রাতে কুমার রামেন্দ্র নারায়ণ হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং তার দু’দিন পর মারা যান।সমাপ্তী হয় এক ঐতিহাসিক মামলার এবং এক হতভাগ্য রাজকুমারের ভাগ্য বিড়ম্বনার সত্য কাহিনীর।

লেখকঃ এ্যাডভোকেট সুপ্রীম কোর্ট, চীফ ইডিটর এএলআর

এই সংবাদ টি সবার সাথে শেয়ার করুন




দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  © All rights reserved © 2018 dainikinternational.com
Design & Developed BY Anamul Rasel