মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৪২ অপরাহ্ন

ঘোষনা :
  সম্পূর্ণ আইন বিষয়ক  দেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকা   দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল এর  পক্ষ থেকে সবাইকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা   । 
সংবাদ শিরোনাম :
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে কিভাবে জামিন নিবেন কুষ্টিয়াস্থ খোকসা ওয়েলফেয়ার এ্যাসোসিয়েশনের অফিস উদ্বোধন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত মত প্রকাশের স্বাধীনতা, আদালত অবমাননা, শাস্তি ও বাস্তবতা! জমি, বাড়ী, ফ্ল্যাট হতে কেউ দখলচ্যূত হলে কি করবেন? জমি-জমা নিয়ে যে কোন ধরণের বিরোধ দেখা দিলে কি করবেন? জমি অধিগ্রহণ কি, কেন, কখন, কিভাবে? নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু আইনে প্রথম রায়ঃ অনুকরণীয়, অনুসরণীয় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা না করার আদেশ বনাম আইন ও সংবিধান! নাবালক সন্তান উদ্ধার কিংবা অভিভাবকত্ব নির্ধারণ করবেন কিভাবে? স্বামী বা স্ত্রীর পরকীয়ার ভয়ঙ্কর পরিণতি ও আইনী প্রতিকার!


বার কাউন্সিল: শিক্ষানবীশ আইনজীবী আন্দোলন ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা!

বার কাউন্সিল: শিক্ষানবীশ আইনজীবী আন্দোলন ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা!

 

কে এম মাহ্ফুজুর রহমান মিশু

বাংলাদেশের শ্রদ্ধাভাজন বিচারপতিবৃন্দের বক্তেব্যের মঞ্চে হরহামেশাই শোনা যায়, আদালতের দুটি ডানা। একটি বিচারপতি অন্যটি আইনজীবী। এই দুটির সমন্বয়ে বিচার বিভাগ। এই দুই শ্রেণীর বিজ্ঞ মানুষের বিচরনে আদালতের কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়ে থাকে। এ দুই মহান পেশায় অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বার কাউন্সিলের বিষয়টি ভাবতেই অভিযোগের হিড়িক দেখা যায়। আদালতের একটি ডানা যেন ইস্পাত দিয়ে তৈরী, অন্যটি নিরেট বাঁশের গাঁথুনি। কিন্তু সমান্তরাল সমন্বয়ের ভিত তৈরী না হলে আমরা এগুবো কিভাবে? একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দোড়গোড়ায় মানবসভ্যতা। আদালতে অ্যার্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার এখন নেহায়তই ঠুনকো ব্যাপার। সকল অর্গাণকে ডিজিটালাইশনের আওতায় আনতে সরকারের প্রায় সকল আয়োজনই সম্পন্ন। এমন সময় বাতির নিচে ঘুটঘুটে অন্ধকারের অভিযোগ বার কাউন্সিলের দিকে।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের মতো একটি সংস্থাকে ডিজিটালাইশনের পুরোপুরি আওতাভুক্ত না করা, পরীক্ষায় দীর্ঘসূত্রিতা, কাউন্সিলের এনালগ কার্যক্রমের অস্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার অভাব প্রভৃতি এখন প্রশ্নবানে জর্জরিত। এরই মধ্যে বৈশি^ক মহামারি করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) যেন বার কাউন্সিলে প্রাথমিক ধাপে উত্তীর্ণ ১২,৫০০ শিক্ষানবীশের জন্য ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে গেছে। এদিকে প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষার্থী এমসিকিউ পরীক্ষার প্রতিক্ষায় ব্যাকুল। প্রতি ক্যালেন্ডার ইয়ারে এনরোলমেন্ট পরীক্ষার সম্পূর্ণ প্রসেস সম্পন্ন করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশনা মানতে না পারা বার কাউন্সিলের জন্য আদালত অবমাননার শামিল হয়ে গেছে। অপরদিকে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মানবিক বিবেচনায় শিক্ষানবীশ সনদ প্রদানের দাবিতো রয়েছেই। সবমিলে একটা ভ্যাপাচ্যাপা অবস্থা।

একজন আইনের শিক্ষার্থীকে নূন্যতম এলএল বি পাশ করে ৬ মাসের শিক্ষানবীশ (পিউপিলেজ) কাল অতিবাহিত করে প্রাথমিক ধাপে পরীক্ষার অনুমতি নিতে হয়। শুরু হয় তীর্থের কাকের মত ক্ষণ গণনা। বার কাউন্সিল আইন অনুযায়ী উক্ত ৬ মাস পর পরীক্ষা গ্রহণ করার কথা থাকলেও কর্তৃপক্ষের গা ঝাড়া দিতে দিতে আড়াই তিন বছর লেগে যায়। গত ২০১৫ সালের আগে বছরে অন্তত একবার পরীক্ষা হতো। বাংলাদেশের বাইরে পৃথিবীর কোথাও পরীক্ষায় দীর্ঘসূত্রিতার এই অদ্ভ’ত পদ্ধতি আছে কিনা জানা নেই। এদিকে অন্যান্য পেশার প্রতি নিরাসক্ত হয়ে সুখের আশায় স্বল্প মেয়াদী পাস কোর্স করে একই কাতারে দাঁড়ায় অনেকে। এদের দিকটা আরো বেশী শোচনীয়। এমতাবস্থায় পাবলিক কিংবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীবৃন্দ এই মহান পেশার প্রতি আকর্ষিত হবে কীভাবে?

সম্প্রতি উদ্ভ’ত করোনার মহাদুর্যোগে মানব সভ্যতার আজ ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের বিভিন্ন সংগঠন সুখ-দু:খের অবস্থা জানিয়ে উধ্বর্তন কর্তা ব্যক্তিদের কাছে স্মারকলিপিও প্রদান করেছেন। কিন্তু দেনদরবার করেও নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে পারছেন না। অগত্যা পারিবারিক দ্বায়বদ্ধতা আর বাচাঁর তাগিদে ভার্চুয়াল আন্দোলনের পথই বেঁচে নিয়েছেন। আগামী ৩০ শে জুলাই ঢাকা সহ প্রত্যেক জেলায় আন্দোলন কর্মসূচিও গৃহীত হয়েছে। কিন্তু এই আন্দোলন কতখানি ফলপ্রসূ হবে সেটিই বা কে জানে। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো বাঁচাতে পারে শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের। এক্ষেত্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যে ১৯৭২ সালে যুদ্ধ পরবর্তী আপৎকালে মুক্তারবৃন্দকে এ্যাডোভোকেট হিসেবে উন্নীত করেছিলেন সে ব্যাপারটি নজীর হতে পারে।

তাছাড়াও The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order,1972 , এর ২৭(১)(ডি) অনুচ্ছেদ মাফিক প্রাথমিক ধাপে উত্তীর্ণ ২০১৭ এবং ২০২০ সালের শিক্ষানবীশদের, আদেশ ৪০(১) ও ৪০(২)(এম) অনুযায়ী গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা সনদ প্রদান করতে আইনী কোন বাধা নিষেধ নেই। অর্ডার ৪০(১)-এ বলা হয়েছে ‘The Bar Council may, with the prior approval of the Government by notification in the official Gazette, make rules to carry out the purposes of this Order.| Article ৪০(২)(এম)-এ বলা হয়েছে ‘the examination to pass for admission as an advocate..’ অতএব এটি বার কাউন্সিলের সংরক্ষিত ক্ষমতা। শুধুমাত্র প্রনীত বিধিতে আইন মন্ত্রনালয়ের অনুমতি নিতে হবে। এটি আইন মন্ত্রনালয়ের রুটিন ওয়ার্ক। বার কাউন্সিল এ মর্মে রেজুলেশন গ্রহন করে আইন মন্ত্রনালয়ে পাঠিয়ে দিবেন, মন্ত্রনালয় সেটির অনুমোদন দিবেন, এটিই আইনের বিধান। এক্ষেত্রে কাউন্সিল তার প্রনীত বিধির ৬০(৩)-এর যেকোন জায়গায় সাপ্লিমেনটারি আইন সংযুক্ত করলে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের আইনজীবী হতে কোন আইনী বাধা থাকবেনা।

এই পেশার মানুষেরা মধ্যবিত্ত না উচ্চ বিত্ত, নাকি বিত্তের বাইরে তা বোধগম্য হয়না। পরিবারবর্গ শিক্ষানবীশ আইনজীবিদের এগিয়ে নিচ্ছেন। এতে তাদের কী রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা বর্ণনাতীত। কিন্তু পৃথিবী সৃষ্টি লগ্ন থেকে রয়্যাল এই পেশার হালহকিকতের জন্য আসলে কী দায়ী? পৃথিবীর বহু প্রতিষ্ঠিত মানুষ এই পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন। তাহলে আমাদের প্রিয় মাতৃভ’মির ৭০ হাজার শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের নাস্তানুবাদ অবস্থা কেন? এসব অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বিগত ২০১৪ সালের বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বনাম দারুল ইহসান মামলায় মাননীয় আপীলেট ডিভিশন ২০১৭ সালে পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণা করেন। মামলায় ১২ টি নির্দেশনার সর্বশেষ নির্দেশনা ছিল ‘The Bar Council shall complete the enrollment process of the applicants to be enrolled as Advocates in the district court each Calendar year’ ’ সুতরাং প্রতি ক্যালেন্ডার ইয়ারে এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় সম্পূর্ণ প্রসেস সম্পন্ন হবে এটিই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। এই দায় এবং শিক্ষানবীশদের তোড়জোড়ে বার কাউন্সিল চলতি বছরে ২৮ ফ্রেব্রুয়ারি প্রাথমিক ধাপের পরীক্ষা সম্পন্ন করলেও অঘোষিত থেকে যায় লিখিত পরীক্ষার সিডিউল।

ক্রান্তিকালীন মহা সংকটময় এই পরিস্থিতির উন্নতি কবে নাগাদ হতে পারে সেটি নিশ্চিতভাবে বলা মুশকিল। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন মাধ্যম বলছেন আনুমানিক ৩/৪ বছর লাগবে। করোনাকালীন এই সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং বার কাউন্সিলের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে যে দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে তাতে বছর দুই আড়াইয়ের আগে পুরো প্রসেস সম্পন্ন করা সম্ভবপর নয়। গত ২০১৭ সালের প্রাথমিক ধাপ শেষে আড়াই মাসের লিখিত পরীক্ষা হয়েছিলো। এছাড়াও লিখিত খাতা নিরীক্ষার কাজ যেহেতু বিচারপতি মহোদয়বৃন্দ করে থাকেন সেটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। এমনিতেই বিচারপতি মহোদয়দের ওপর লক্ষ লক্ষ মামলা ঝুলে আছে সুতরাং এটি অত্যন্ত কম সময়ে নিরীক্ষিত হবে ভেবে নেওয়া অমূলক ব্যাপার।

৭০ হাজার শিক্ষানবীশ এখন পরীক্ষার প্রহর গুনছেন। সামগ্রিক বিচারে ২০১৭ ও ২০২০ সালে প্রাথমিক ধাপে উত্তীর্র্ণদের সনদ প্রদান অযৌক্তিক কিছু নয়। গত ২০১৮ সালের মে মাসের বার কাউন্সিলের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কর্তৃক প্রকাশিত ভোটার তালিকা অনুসারে আইনজীবীর সংখ্যা ৪৩,৮৮৪ জন। ২০১৮ সালের ২৩শে ডিসেম্বরে ৭,৭৩২ জন আইনজীবী তালিকাভুক্ত হয়। দুইটি সংখ্যা যোগ করলে হয় ৫১,৬১৬ জন। এর মধ্যে অনেক বিজ্ঞ জেষ্ঠ্য আইনজীবী মৃত্যুবরন করেছেন। ১৮ কোটি জনসংখ্যার এই দেশের তুলনায় আইনজীবী অপ্রতুল। আমাদের প্রতিবেশী দেশের আইনজীবী সংখ্যা ১২ লাখ। প্রতি বছর পরীক্ষায় পাশের হার ৭০ শতাংশ। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বার কাউন্সিল বেশ কঠিনভাবেই আইনজীবী যাচাই-বাছাই করেন।

সামগ্রিক পরিস্থিতির ইতিহাস বিবেচনায় এই আলোকিত পেশার দাফন সম্পন্ন করাটা নেহায়তই আতœঘাতী বৈ কিছু নয়। একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে এসে আমরা হতাশার গ্লাণিকর পরিস্থিতিতে শিক্ষানবীশদের ডুবে যেতে দিতে পারিনা। সুতরাং স্বপ্নে বিভোর এ তরুণ শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের হতাশার বেড়াজাল থেকে বের করতে আমাদের আরো নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করতে হবে। ব্যর্থতার বীজ বপনকারীদের খুঁজে বের করে সমাধানের পথ বের করতে হবে। ব্যাঙের ছাতার মত গিজ গিজ করে গজে ওঠা আইন কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট ব্যাবসাধারীদের লাগাম টেনে ধরতে হবে, সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশনানুযায়ী প্রতি ক্যালেন্ডার ইয়ারে এনরোলমেন্ট পরীক্ষার সম্পূর্ণ প্রসেস সম্পন্ন করতে হবে এবং করোনার সংকটময় মুহূর্তে মানবিক ও বাস্তবিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সনদ সমস্যার সুরাহা করতে হবে। কাউন্সিলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দায় ঝেড়ে ফেলে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যেতে হবে। আজকের এই স্বাপ্নিক ভুক্তভোগী শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের সামনের দিগন্ত প্রসারিত করতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের মহান ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন এখন সময়ের দাবী।

লেখক: সাংবাদিক ও অ্যাসোসিয়েট কনসালটেন্ট (লিগ্যাল), অরোরা রিসার্চ এ্যান্ড কনসালটেন্সি ঢাকা, বাংলাদেশ।
মোবাইল: ০১৭২৩২১২৮২৭, Mahfujiub@gmail.com

এই সংবাদ টি সবার সাথে শেয়ার করুন




দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  © All rights reserved © 2018 dainikinternational.com
Design & Developed BY Anamul Rasel