বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:২৪ পূর্বাহ্ন

ঘোষনা :
  সম্পূর্ণ আইন বিষয়ক  দেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকা   দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল এর  পক্ষ থেকে সবাইকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা   । 
সংবাদ শিরোনাম :
জমি-জমা নিয়ে যে কোন ধরণের বিরোধ দেখা দিলে কি করবেন? জমি অধিগ্রহণ কি, কেন, কখন, কিভাবে? নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু আইনে প্রথম রায়ঃ অনুকরণীয়, অনুসরণীয় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা না করার আদেশ বনাম আইন ও সংবিধান! নাবালক সন্তান উদ্ধার কিংবা অভিভাবকত্ব নির্ধারণ করবেন কিভাবে? স্বামী বা স্ত্রীর পরকীয়ার ভয়ঙ্কর পরিণতি ও আইনী প্রতিকার! উন্মাদ বা পাগলের প্রতি নির্দয় আচরণ করলেই শাস্তি! স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের পর সন্তান কার কাছে থাকবে! খোকসার এক কৃতি ছাত্র, সফল মানুষ ও সুখী মানুষের প্রতিচ্ছবি! কুমারখালীর বাঁশগ্রামে ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ধান কেটে নিয়েছে জোতদাররা


বিমানবন্দরে এক স্বামীকে নিয়ে দু’স্ত্রীর টানাটানি, আইন ও বাস্তবতা!

বিমানবন্দরে এক স্বামীকে নিয়ে দু’স্ত্রীর টানাটানি, আইন ও বাস্তবতা!

 

এ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:

ঢাকার বিমানবন্দরে সম্প্রতি প্রবাসফেরত এক ব্যক্তিকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া নিয়ে দুই স্ত্রীর বাদানুবাদ, ধাক্কাধাক্কি ও টানা-হেঁচড়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিও দেখে বোঝা যাচ্ছে, প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে ওই ব্যক্তি দ্বিতীয় বিয়ে করেন, এবং দেশের ফেরার পর তাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে এসেছেন দুই স্ত্রীই। বিয়ে নিয়ে প্রতারণা, আইনে নিষেধ থাকলেও কিভাবে বারবার বিয়ে করে ‘বিয়ে পাগলরা। এ বিষয়ে সামাজিকতা, বাস্তবতা ও আমাদের আমাদের আইন কি বলে তা নিয়েই আজকের নিবন্ধ। সম্মানীত পাঠক! আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০১৯ সালের নভেম্বরের শেষদিকে ঢাকার তেজগাঁও থানার পুলিশ জাকির হোসেন ব্যাপারি নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেন, যিনি তথ্য-পরিচয় গোপন করে, প্রতারণা করে ২৮৬টি বিয়ে করেছেন। এই বিপুল সংখ্যক বিয়ে করার জন্য তিনি ১৪ বছর সময় নিয়েছেন। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক্্র মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ খবরটি তখন ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

রিমি ও সুজন (ছদ্মনাম) দুজনে ভালবেসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সাবালক-সাবালিকা হিসেবে এ ধরণের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ও আইনগত অধিকার তাদের আছে। সেই অধিকারের ভিত্তিতে তারা স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এ বিয়ের কথা পরিবারের কাউকে জানাননি। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই রিমি বিয়ের কথা গোপন রেখে পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী বিয়ে করে ফেলেন। প্রিয়াকে হারিয়ে পাগল হয়ে উঠেন সুজন। বিয়ে নিয়ে রিমির এ প্রতারনার রয়েছে আইনগত সমাধান।

সুজিত ও শান্তা’র (ছদ্মনাম) মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক। হঠাৎ ঠুনকো এক বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যায়। সুজন ফন্দি ফিকির করে একটি ভুয়া কাবিননামা তৈরী করে শান্তা’কে স্ত্রী হিসেবে দাবী করে। এ নিয়ে উভয় পরিবার উদ্বিগ্নতার মধ্যে দিন কাটাতে থাকে। কিন্তু কিভাবে করবে এর আইনগত সমাধান?

ছন্দা ও শহিদ (ছদ্মনাম) বিয়ে হয়নি। অথচ বিয়ে হয়েছে-এমন কথা বলে মিথ্যা প্রমাণ দেখিয়ে স্বামী স্ত্রীর মতো ঘর সংসার করতে থাকে। একসময় ছন্দা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। শহীদ বিয়ে অস্বীকার করে এড়িয়ে চলে। অনাগত সন্তানের ভবিষ্যত ও পিতৃ-পরিচয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে ছন্দা।

রহমান সাহেব প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেলেন। দুশ্চিন্তায় পড়ে যান স্ত্রী সানজিদা। কিন্তু তিনি জানেন না যে, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, আর বিয়ে যদি করতেই হয় তবে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি আবশ্যক। প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করলে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে স্বামীকে।

উপরের এ ঘটনাগুলো আমাদের সমাজে নিতান্তই পরিচিত ঘটনা। এগুলো বিয়ে-সংক্রান্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এসবের রয়েছে আইনগত প্রতিকার। ডি এফ মোল্লা তাঁর ‘মুসলিম আইনের মূলনীতি’ বইয়ে বিবাহের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন “বিবাহ বা নিকাহ এমন একটি চুক্তি যার উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য হলো বৈধভাবে সন্তান লাভ ও প্রতিপালন। বিচারপতি মাহমুদ তাঁর ‘আঃ কাদির ও সালিসী মোকদ্দমার রায়ে বলেছেন “মুসলিম বিবাহ কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, একটি বিশুদ্ধ দেওয়ানী চুক্তি যার উদ্দেশ্য পারিবারিক জীবন যাপন ও বৈধ সন্তান দান। উপরোক্ত দুটি সংজ্ঞা থেকে আমরা অনায়াসে বলতে পারি যে, সম্ভোগ ও সন্তান সমূহের বৈধ করনার্থে যে চুক্তি সম্পাদিত হয় তাকে বিবাহ বলে।

দন্ডবিধির ৪৯৩ ধারা থেকে ৪৯৬ ধারা পর্যন্ত বিয়ে-সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির বিধান আছে, যার অধিকাংশ অপরাধই জামিন অযোগ্য।

প্রতারনার মাধ্যমে বিয়ে করলে ১০ বছর কারাদন্ড : ধারা ৪৯৩ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে প্রতারণামূলকভাবে আইনসম্মত বিবাহিত বলে বিশ্বাস করান, কিন্তু আদৌ ওই বিয়ে আইনসম্মতভাবে না হয় এবং ওই নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদ- এবং অর্থদ-ে দ-িত হবেন।

স্বামী বা স্ত্রী থাকা স্বত্বেও বিয়ে করলে ৭ বছর কারাদন্ড: ৪৯৪ ধারায় উল্লেখ আছে, যদি কোনো ব্যক্তি এক স্বামী বা এক স্ত্রী জীবিত থাকা সত্ত্বেও পুনরায় বিয়ে করেন, তাহলে দায়ী ব্যক্তি সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদ-ে দ-িত হবেন এবং অর্থদ-েও দ-িত হবেন। তবে যে সাবেক স্বামী বা স্ত্রীর জীবদ্দশায় বিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, বিয়ের সময় পর্যন্ত সে স্বামী বা স্ত্রী যদি সাত বছর পর্যন্ত নিখোঁজ থাকেন এবং সেই ব্যক্তি বেঁচে আছেন বলে কোনো সংবাদ না পান, তাহলে এ ধারার আওতায় তিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধী বলে গণ্য হবেন না।

দ্বিতীয় বিয়ে করলে ও পূর্বের বিয়ে গোপন রাখলে শাস্তি ১০ বছর: ৪৯৫ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয় বা পরবর্তী বিয়ে করার সময় প্রথম বা আগের বিয়ের তথ্য গোপন রাখেন, তা যদি দ্বিতীয় বিবাহিত ব্যক্তি জানতে পারেন, তাহলে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদ-ে দ-িত হবেন এবং অর্থদ-েও দ-িত হবেন।

আইনসম্মত বিয়ে না হলে ৭ বছর জেল: ৪৯৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি আইনসম্মত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ব্যতীত প্রতারণামূলকভাবে বিয়ে সম্পন্ন করেন, তাহলে অপরাধী সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদ- এবং অর্থদ-ে দ-িত হবেন।

স্বামীর অজ্ঞাতে মিলামেশা করলে ৭ বছর জেল: ৪৯৭ ধারায় ব্যভিচারের শাস্তির উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো নারীর সঙ্গে তার স্বামীর সম্মতি ব্যতীত যৌনসঙ্গম করে এবং অনুরূপ যৌনসঙ্গম যদি ধর্ষণের অপরাধ না হয়, তাহলে সে ব্যক্তি ব্যভিচারের দায়ে দায়ী হবে, যার শাস্তি সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদ-সহ উভয় দ-। এ ক্ষেত্রে নির্যাতিতাকে অন্য লোকের স্ত্রী হতে হবে। তবে ব্যভিচারের ক্ষেত্রে স্ত্রীলোকের কোনো শাস্তির বিধান আইনে নেই।

ফুসলিয়ে কোন বিবাহিত মহিলাকে নিয়ে গেলে ২ বছরের জেল : ৪৯৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বিবাহিত নারীকে অন্যের স্ত্রী জানা সত্ত্বেও ফুসলিয়ে বা প্ররোচনার মাধ্যমে যৌনসঙ্গম করার উদ্দেশ্যে কোথাও নিয়ে যাওয়া এবং তাকে অপরাধজনক উদ্দেশ্যে আটক রাখা অপরাধ। এ ধারা অনুযায়ী অপরাধী ব্যক্তি দুই বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদ- এবং অর্থদ-সহ উভয় ধরনের শাস্তি পাবে।

প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে ১ বছরের জেলঃ কোনো মুসলমান ব্যক্তি ১ম স্ত্রী থাকলে সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া এবং প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করেন, তিনি ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ (৫) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করবেন। অভিযোগে দোষী প্রমাণিত হলে ওই ব্যক্তিকে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদ- বা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দ- হতে পারে।

দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে প্রথম স্ত্রী যদি সন্তানদের নিয়ে আলাদাভাবে বসবাস করেন তবুও স্বামীকে প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে হবে। স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে স্বামী আইনত বাধ্য থাকিবে। ভরণপোষণ ছাড়াও স্ত্রী ও সন্তানরা উত্তরাধিকারীর অধিকার লাভ করবেন এবং মোহরানার টাকা পরিশোধ করা না হলে বকেয়া ভূমি রাজস্ব আদায়ের মতো আদায় করা হবে।

বিচার চেয়ে কোথায় যাবেন 

এবার জানার বিষয় এ ধরণের অপরাধের বিচার চেয়ে কোথায় যাবেন কি করবেন। বিয়ে-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য অভিযোগ থানা বা আদালতে গিয়ে চাওয়া যাবে। থানায় এজাহার হিসেবে মামলা দায়ের করতে হবে। যদি মামলা না নিতে চায় তাহলে সরাসরি জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গিয়ে মামলা দায়ের করা যাবে। কেউ কেউ থানায় না গিয়ে সরাসরি আদালতে মামলা করে থাকেন। এতে কোনো সমস্যা নেই। আদালতে মামলা করার সময় যথাযথ প্রমাণসহ অভিযোগের স্পষ্ট বর্ণনা দিতে হবে এবং সাক্ষীদের নাম-ঠিকানাও দিতে হবে। আদালত অভিযোগকারীর জবানবন্দি গ্রহণ করে যেকোনো আদেশ দিতে পারেন। অনেক সময় অভিযোগ আমলে না নিয়ে প্রাথমিক তদন্তের জন্য নির্দেশ দিতে পারেন।

আর কেউ যদি স্বামী বা স্ত্রীর পরিচয়ে নিজেদের অন্তরঙ্গ ছবি ফেসবুক বা অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে অথচ আদৌ কোনো বিয়ে সম্পন্ন হয়নি তাহলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা করার সুযোগ আছে এবং এ মামলা থানায় করতে হবে। এ ছাড়া ভুয়া কাবিননামা তৈরি করলে জালিয়াতির অভিযোগও আনা যাবে।

 যে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবেঃ
বিয়ে যেভাবেই সম্পন্ন হোক না কেন কাবিননামা কিংবা বিয়ের সব দলিল নিজের কাছে রাখা উচিত। কাবিননামার ওপর কাজির সীল স্বাক্ষর আছে কি-না যাচাই করে নিতে হবে এবং কোন কাজির মাধ্যমে বিয়েটি সম্পন্ন হলো তার সঙ্গে যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করে নেওয়া ভালো। মুসলিম বিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। এটা স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই মনে রাখতে হবে। বর্তমানে হিন্দু বিয়ের নিবন্ধনও ঐচ্ছিক করা হয়েছে। বিয়ের হলফনামা করা থাকলে তাও সংগ্রহে রাখতে হবে।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’। Email:seraj.pramanik@gmail.com, মোবাইল: ০১৭১৬-৮৫৬৭২৮

এই সংবাদ টি সবার সাথে শেয়ার করুন




দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  © All rights reserved © 2018 dainikinternational.com
Design & Developed BY Anamul Rasel