সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৩:৩৬ অপরাহ্ন

ঘোষনা :
  সম্পূর্ণ আইন বিষয়ক  দেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকা   দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল এর  পক্ষ থেকে সবাইকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা   । 


বিয়ে প্রমাণে কাবিননামা জরুরী নয়। সিদ্ধান্ত উচ্চ আদালতের

বিয়ে প্রমাণে কাবিননামা জরুরী নয়। সিদ্ধান্ত উচ্চ আদালতের

এ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের পর থেকে মুসলিম বিয়ে ও বিয়েবিচ্ছেদে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং নিবন্ধন না করাকে দ-নীয় অপরাধ হিসেবেও গণ্য করা হয়েছে। এরপরও নিবন্ধনহীন মুসলিম বিয়ে বৈধ হিসেবেই আইন ও সমাজের চোখে গণ্য হয়ে আসছে। আবার হিন্দু আইনে বিয়ে নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা এখন পর্যন্ত আরোপ করা হয়নি। এখন কোনো মুসলিম বা হিন্দু বিয়ে নিবন্ধন না হলে কি বিয়ের কারণে উদ্ভূত দায়দায়িত্ব কোনো পক্ষ অস্বীকার করতে পারবে? বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

মমতাজ বেগম ও আনোয়ার হোসেন একে অপরকে ভালোবাসেন। সে সূত্র ধরে দুজন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ঘর-সংসার করতে শুরু করেন। কিন্তু তাদের মধ্যে বিয়ের কোনো কাবিননামা রেজিস্ট্রি হয়নি। এক পর্যায়ে লোভী আনোয়ার হোসেন মমতাজ বেগমের কাছে যৌতুক দাবি করে নির্যাতন করে এবং যৌতুক না পাওয়ায় মমতাজ বেগমকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। মমতাজ বেগম তার ভরণপোষণ এবং দেনমোহর চেয়ে পারিবারিক আদালতে মামলা ঠুকে দেন। কিন্তু বিধিবাম! আনোয়ার হোসেন মমতাজ বেগমের সঙ্গে তার বিয়েকে অস্বীকার করে আদালতে জবাব দাখিল করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এদিকে মমতাজ বেগম দাবি করেন, তাদের মধ্যে মুসলিম আইন অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে এবং তারা দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই একত্রে বসবাস করছেন এবং স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই পরিচয় দিয়েছেন। মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে পারিবারিক আদালত আদেশ দেয়, তাদের মধ্যে বিয়ের অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে। পারিবারিক আদালতের এ আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ আনোয়ার হোসেন ১৯৯৬ সালে হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন দায়ের করেন। হাইকোর্ট বিভাগের একটি একক বেঞ্চ ১৯৯৯ সালে পারিবারিক আদালতের আদেশটি খারিজ করে দেন। হাইকোর্ট বিভাগ তার রায়ে বলেন, তাদের মধ্যে কোনো প্রকার কাবিননামা সম্পন্ন হয়নি যা বিয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং মমতাজ বেগম তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। হাইকোর্ট বিভাগের এ রায়ের বিরুদ্ধে মমতাজ বেগম লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি) দায়ের করেন এবং আপিল মঞ্জুর হয় তিনটি বিষয়কে বিবেচনা করেথ ১. মুসলিম আইন অনুযায়ী বিয়ে রেজিস্ট্রি না হলে এটি কি বাতিল, অবৈধ বা অস্তিত্বহীন কি-না;
২. তিন বছর ধরে তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস করা এবং বসবাসের শর্ত বৈধ বিয়ে হিসেবে গণ্য হবে কি-না;
৩. হাইকোর্ট বিভাগ রিভিশনাল এখতিয়ার প্রয়োগ করে নিম্ন আদালতের আদেশ এবং পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বৈধ বিয়ের অস্তিত্বের বিষয়ে বিবেচনা করেছেন কি-না।
আপিল বিভাগে মমতাজ বেগমের পক্ষে ২০০৩ সালে আপিলটি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার রাবেয়া ভুঁইয়া। সিভিল আপিল নাম্বার-১৩৯/২০০৩। তিনি আপিলে দাবি করেন, কাবিননামার অনুপস্থিতিতে বিয়ের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যাবে নাথ এই মর্মে হাইকোর্ট বিভাগের বিবেচনা যুক্তিসঙ্গত নয় এবং তা আইনের সঠিক মর্ম নয়। অবশেষে ৩১ জুলাই ২০১১ তারিখে আপিল বিভাগ মমতাজ বেগমের পক্ষে রায় দেয়। মমতাজ বেগম বনাম আনোয়ার হোসেন মামলায় আপিল বিভাগের রায়ে বিচারপতি এস কে সিনহা মন্তব্য করেছেন, মুসলিম নর ও নারী যদি স্বামী ও স্ত্রীর পরিচয়ে দীর্ঘদিন বসবাস করেন এবং তাদের মধ্যে যদি রেজিস্ট্রিকৃত কাবিননামা না-ও হয়ে থাকে, তাহলেও এখানে বৈধ বিয়ের অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকতে পারে। তারা উভয়ে স্বামী-স্ত্রী এবং তাদের মধ্যে মুসলিম আইন অনুযায়ী বৈধ বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলেও গণ্য হতে পারে। সুতরাং কাবিননামা ছাড়া স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বসবাস করলে বৈধ বিয়ের অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকতে পারে।
বিয়ে মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুখকর অনুভূতি ও প্রজন্ম বিস্তারের একমাত্র উপায় হলেও কখনো কখনো তা অভিশাপ হিসেবেও দেখা দেয়। বিয়েকে কেন্দ্র করে অপহরণ, ধর্ষণ, খুনের মতো ঘটনা ঘটে চলেছে। বিয়ের পর মেয়েরা স্বামীর ঘর করবে। সংসারের খুঁটিনাটি দেখবে। স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, ছেলেমেয়ে নিয়ে হাসিখুশিতে দিন কাটাবে এটাই বাঙালি বধূর বৈশিষ্ট্য। একজন স্বামীও তার স্ত্রীকে ভালোবাসবে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুখে বসবাস করবে এই আশা সবার। কিন্তু এমনটি এখন আর দেখা যায় না। বরং পারিবারিক অশান্তি আর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়াঝাটি এখন যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আর এগুলো ঘটছে বিয়ে-পরবর্তী পরকীয়া, প্রেম, বিয়েকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণে। এ রকম চিত্র এখন পত্রপত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে।
ভারতের কেরালার একটি পারিবারিক আদালতে এক নারী ভরণ পোষণের দাবিতে মামলা করেন যেখানে বাদীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত পন্থায় এক ছাদের নিচে স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করছিলেন তিনি। বিয়ে সম্পর্কিত কোনো দালিলিক প্রমাণ না থাকায় নিম্ন আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন। কিন্তু কেরালা হাইকোর্টে বিচারপতি সি এস কারনান এ সিদ্ধান্তকে নাকচ করে বিবাহের সংজ্ঞায় যুগান্তকারী ও যুগোপযোগী এক সিদ্ধান্ত দেন। বলা হয়, আইনে সংজ্ঞায়িত প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে যদি বিবাহপূর্ব কোনো শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হয় এবং একত্রে বসবাস করে সে ক্ষেত্রে এটিকে ‘বিবাহ’ হিসেবে ধরা হবে এবং একত্রে বসবাসকারী ছেলে-মেয়েদের ‘স্বামী-স্ত্রী’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
যদি কোনো অবিবাহিত ছেলে-মেয়ে যথাক্রমে ২১ এবং ১৮ বছর অতিবাহিত করে এবং একত্রে বসবাস করতে চায়, ‘ফ্রিডম অব চয়েজ’ অনুসারে এটা তাদের সাংবিধানিক অধিকার। তবে এই সম্পর্কের সকল পরিণতি বা দায়ও তাদের ওপর বর্তাবে। কারণ কোনো ‘কাজ’ বা ‘আচরণ’ দ্বারা দায়িত্বশীল পক্ষ তার ফলাফল অনুসরণ করবে এটাই স্বাভাবিক।
আদালতের মতে, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সমাজভেদে ভিন্ন হতে পারে কিন্তু বিয়ের কিছু সাধারণ ফলাফল (যেমন স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের প্রতি বাধ্যবাধকতা, উৎপাদিত সন্তানের প্রতি দায়দায়িত্ব বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা) সব সমাজেই স্বীকৃত। সুতরাং দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে যখন একত্রে বসবাস করে তখন তারা নিজেদের মধ্যে সম্মতির ভিত্তিতে একই ছাদের নিচে থাকে বলে ধরে নেয়া যায়। সুতরাং সমাজে বিবাহপূর্ব অরাজকতা রোধে ও ছেলে-মেয়েদের পারস্পরিকভাবে একে অপরের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের এই একত্রে বসবাসকে বিবাহভিন্ন অন্য কোনো সংজ্ঞায় ফেললে সমাজের শৃঙ্খলার জন্য অনেক সময় মারাত্মক হুমকি হতে পারে। তাই জেনেশুনে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে একত্রে বাস করবে, বিয়ের সব সুবিধা ভোগ করবে অথচ এর দায়িত্ব নেবে না; এমনটি হতে দেয়া অনুচিত। তাই যখন তারা একই ছাদের নিচে বসবাস করবে তখন বিবাহের ‘অনুমান নীতি’র ওপর ভিত্তি করে তাদের স্বামী-স্ত্রী বলে গণ্য করা সমীচীন।
আদালত তার রায়ে আরো বলেন, যখন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েরা এভাবে একে অপরের সঙ্গে বসবাস করবে তখন তাদের উভয়ে বা কোনো একজন ওই বসবাসকে ‘বিয়ে’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য ‘ঘোষণামূলক মোকদ্দমা’ দায়ের করতে পারবে এবং সে অনুযায়ী সরকারি সব রেজিস্ট্রারে তাদের নাম স্বামী-স্ত্রী গণ্য করতে হবে যেখানে স্বামী-স্ত্রীর সব অধিকার ও দায়দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তাবে।
উল্লেখ্য, ইংল্যান্ডে স্বীকৃতিমূলক আইনের মাধ্যমে ছেলে-মেয়েকে বিয়ে ছাড়া একত্রে বসবাস করার অনুমতি দেয়া হয়েছে এই শর্তে যে তারা যদিও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ নয় তথাপি একে অপরের প্রতি দায়িত্ব, ভরণপোষণ, সন্তানের দায়িত্ব গ্রহণ, ব্যক্তিগত ঋণ থেকে উদ্ভুত দায় এড়িয়ে যেতে পারবে না।
আন্তর্জাতিক আইন যেমন সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ ১৬, আইসিইএসসিআর-এর ১০ অনুচ্ছেদ, আইসিসিআরপির ২৩ অনুচ্ছেদে পুরুষ ও নারীর মধ্যে সম্মতির ভিত্তিতে বিয়ের কথা বলা হলেও আনুষ্ঠানিকতার উল্লেখ নেই। একই ধরনের অভিব্যক্তি ইউরোপ-আমেরিকার আঞ্চলিক কনভেনশনগুলোতেও দেখা যায়। কিছু দেশীয় আইনে আবার আগ বাড়িয়ে বিবাহের আনুষ্ঠানিকতাকে এড়িয়ে বলা হয়েছে ‘দুজন ব্যক্তির’ মধ্যে বিয়ে সম্পাদিত হতে পারে (ছেলে-মেয়ের আবশ্যিকতা পরিহার করা হয়েছে)। এ ক্ষেত্রে ২০০৫ সালের কানাডীয় পার্লামেন্টের অনুমোদন উল্লেখ্য। এসব তথ্য প্রদানের মধ্য দিয়ে সমকামী বিয়ের প্রতি সমর্থন প্রদান উদ্দেশ্য নয়। বরঞ্চ বিশেষ ক্ষেত্রে কোনো নারী-পুরুষের সম্পর্ককে ‘বিয়ে’ হিসেবে গণ্য করার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতা প্রমাণের শর্ত শিথিল করা যেতে পারে। এতে করে প্রতারিত পক্ষের জন্য আদালতের প্রতিকার পাওয়া সহজ হবে। লিভ টুগেদারের মতো আচরণ রোধে নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু যখন কোনো যুগল এ ধরনের আচরণে জড়িয়ে পড়ে, সে ক্ষেত্রে তাদের একপক্ষ যেন অপরপক্ষকে একতরফাভাবে পরিস্থিতির শিকার না বানাতে পারে, সে জন্য আদালত এ ধরনের সম্পর্ককে ‘অনুমান নীতি’র ওপর ভিত্তি করে আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াও বিয়ে বিবেচনা করতে পারেন। এতে করে পক্ষগণের ওপর দায়-দায়িত্ব আরোপ করা সহজ হবে।

এই সংবাদ টি সবার সাথে শেয়ার করুন




দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  © All rights reserved © 2018 dainikinternational.com
Design & Developed BY Anamul Rasel