মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০১:৩৫ অপরাহ্ন

ঘোষনা :
  সম্পূর্ণ আইন বিষয়ক  দেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকা   দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল এর  পক্ষ থেকে সবাইকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা   । 


আইনজীবীদের আইনী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে

আইনজীবীদের আইনী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে

মুহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাত ত্বোহা

আইন ও আইনজীবী শব্দদ্বয় একে অপরের পরিপূরক।  আইনের শাসন বাস্তবায়নে যারা প্রাণপণ লড়াই করে থাকেন তারাই আইনজীবী।  আইনজীবী ব্যতিত আইনের বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।  অথচ  যারা আইনের শাসন বাস্তবায়নে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর মামলা পরিচালনা করেন তাদেরই নেই কোনো আইনী সুরক্ষা। মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে আইনজীবীকে কোর্ট রুমের বাহিরে সহায়হীন থাকতে হয়। বিভিন্ন সময়ে বিরুদ্ধ পক্ষ কর্তৃক হামলার ঘটনাও দেখা যায়। গত ৩রা নভেম্বর চট্টগ্রাম ১ম যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বেঞ্চ সহকারীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি ও সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি ল’ এলামনাই এসোসিয়েশন সদস্য এডভোকেট মো. মনজুর আলমের উপর হামলা করে। হামলায় আহত আইনজীবী এডভোকেট মো.মনজুর আলম চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসাপাতালে চিকিৎসা নেন। গত ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২ সিলেটে আদালত চত্বরে বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামানের উপর হামলার চেষ্টা চালিয়েছে এক আসামি।  অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান মামলার বাদি পক্ষের আইনজীবী হিসেবে শুনানিতে অংশ নেন। শুনানি শেষে আদালত কালাম হোসেনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে কামাল হোসেন আইনজীবীর উপর হামলার চেষ্টা করেন। গত ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ পটুয়াখালী আইনজীবি সমিতির সদস্য ও পটুয়াখালী জেলা পরিষদ সদস্য এ্যাড. মোঃ বশিরুল আলম’র উপর ৫ লাখ টাকা চাঁদার দাবীতে জনৈক তুহিনের নেতৃত্বে হামলা চালানো হয়। এনিয়ে থানায় মামলা করতে গেলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানান। ১৮ই জানুয়ারী ২০২২ তারিখে চাঁদপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য এডভোকেট আব্দুল্লাহিল বাকির উপর পুলিশ হামলা চালায়।

গত ২ই নভেম্বর ২০২২ তারিখে বগুড়ায় আদালতে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হন শিক্ষানবিশ আইনজীবী আবদুল বারী। চার দিন বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকার পর ৫ই নভেম্বর ২০২২ শনিবার সকাল নয়টার মৃত্য বরণ করেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ টাঙ্গাইল জজ কোর্টের আইনজীবী এবং জেলা অ্যাডভোকেট বার সমিতির যুগ্ম-সম্পাদক মো: রুহুল আমীনের উপর হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। হামলাকারীরা এডভোকেট রুহুল আমীনের মুখ ও মাথা কাপড় দিয়ে পেচিয়ে এলাপাতাড়িভাবে আঘাত করে মুমূর্ষু অবস্থায় রাস্তার ধারে ফেলে রেখে চলে যায়। ২০২০ সনের এপ্রিল মাসের ১৬ তারিখ দুপুরে রাজধানীর টিকাটুলিতে পুলিশের বেধড়ক লাঠিপেটার শিকার হন আইনজীবী তুহিন হাওলাদার। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এই ঘটনায় তুহিন হাওলাদার হামলাকারী পুলিশের বিরুদ্ধে উরধতন কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ দায়ের করেন। ২০২০ সনের মার্চ মাসে নারায়ণগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী খন্দকার মোঃ মিকাইল মিয়া, নিজের পুকুরে খনন কাজ চালানর সময় স্থানীয় সন্ত্রাসীরা তার নিকট চাঁদা দাবী করে। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় সন্ত্রাসীরা গুলি বর্ষণ করে। ২০২০ সনের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ তারিখ পটুয়াখালীর গলাচিপায় অ্যাড মনিরুল ইসলামের উপর হামলা চালায় মাদক ব্যবসায়ী লুপা ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী। মাথা, বুক ও হাতে গুরুতর জখম হওয়ায় তাঁকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে রেফার করা হয়। ২০১৮ সনের ১৫ই ফেব্রুয়ারি বংপুরের আইনজীবী সামছি বেগম মক্কেলের পক্ষে মামলা করতে গিয়ে মামলার বাদী নওরিন  কর্তৃক হামলার শিকার হন। পরে নওরিন কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০১৮ সনের মার্চ মাসের ২৫ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হামলার শিকার হন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য ও তৎকালীন হিউম্যান রাইটস কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জনাব জেড আই খান পান্না। এই হামলার প্রতিবাদে মানব বন্ধন কর্মসূচী পালন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা। এভাবে গত কয়েক বছরে দেশে শতাধিক আইনজীবী হামলার স্বীকার হয়েছেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় যারা প্রাণপণ লড়ে যান তাদেরই যখন আইনী সুরক্ষা না থাকে তখন বিষয়টা উদ্বেগজনক বটে।

 “ বাংলাদেশে বলবৎ ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ১৯৭ ধারায় জজ, ম্যাজিস্ট্রেট তথা সরকারি চাকরিজীবীদের দায়িত্ব পালনের সময় অপরাধ করলে মামলা করার জন্য সরকারের অনুমতি প্রয়োজন হয়। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ৪১ ধারায় বলা হয়েছে, অভিযোগ পত্র দাখিলের আগে সরকারের বা নিয়োগ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোন সরকারি চাকরিজীবীকে গ্রেপ্তার করা যাবে না”।

বাংলাদেশে জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারপতি, সরকারী কর্মকর্তা, কর্মচারী এমনকি দুর্নীতিবাজদের বাঁচাতে  নতুন নতুন আইন তৈরি হলেও আইনজীবীদের সুরক্ষায় অদ্যবধি কোন আইন তৈরি হয়নি। কাজেই নিজে নিরাপদ না হয়ে অন্যের ন্যায়বিচার নিয়ে ভাবা কঠিন হয়ে পড়ে।

আইনজীবীদের সুরক্ষায় আইন প্রণয়ের ব্যাপারে বারবার কথা উঠলেও তার কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয় নাই। যার ফলে ২০২১ সনের ৮ই ফেব্রুয়ারী আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া  আইনজীবী সুরক্ষা আইন প্রণয়নে হাইকোর্টে রিট করেছেন। রিট আবেদনে আইন সচিব, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান, স্বরাষ্ট্র সচিব, বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সংসদ সচিবালয়ের সচিব, বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান, বার কাউন্সিলের সচিব ও পুলিশের আইজিকে বিবাদী করা হয়েছে। আবেদনে আইনজীবী সুরক্ষা আইন প্রণয়নে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না- সেই মর্মে রুল জারির আর্জি জানানো হয়েছে। রিট আবেদনে বলা হয়েছে, সারা বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ৬৭ জনের বেশি বিজ্ঞ আইনজীবী হত্যা, নির্যাতন, হামলা-অপহরণের শিকার হয়েছেন। এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। আইনজীবীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর মামলা পরিচালনা ও শুনানি করতে  হয়। যে কারণে কোর্ট রুম থেকে বের হয়েই আদালতের অফিসার তথা আইনজীবীরা সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন এবং বিভিন্ন সময়ে অমানুষিক ও বর্বর নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তার আগেও ২০১৯ সালের ১২ই ডিসেম্বর আইনজীবীদের সুরক্ষা প্রশ্নে হাইকোর্টে রীট করা হয়। রীটের প্রেক্ষিতে ১২ই জানুয়ারী ২০২০ সালে আইনজীবীদের সুরক্ষা প্রশ্নে হাইকোর্ট রুল জারী করে। হাইকোর্টের রুলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অ্যান্ড লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার অর্ডারস অ্যান্ড রুলস-১৯৭২ অনুযায়ী আইনজীবীদের সুরক্ষার বিধান সংযোজনের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার ব্যর্থতাকে কেন বে-আইনি ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়। আইনসচিব, সংসদসচিব, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিলো। তবে অধ্যাবধি কাল পর্যন্ত কোনো আইন প্রণয়ন হয়নি।

আইনজীবীর ওপর আক্রমণ, অত্যাচার নির্যাতন বেড়েই চলছে। যেহেতু আদালতে বিচারপ্রার্থী বিবাদমান পক্ষদের নিয়ে আইনজীবীদের কাজ করতে হয়, তাই সাধারণভাবে একটা ঝুঁকির বিষয় থেকেই যায়। ইদানীং দেখা যায়, মামলার প্রতিপক্ষ মামলায় হেরে গিয়ে উকিলের ওপর প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে ওঠে। এই প্রতিশোধের মাত্রা হুমকি, অপহরণ, এমনকি হত্যাকান্ড পর্যন্ত গড়ায়। উকিলের ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে, উকিলের পরিবারের ওপরও তারা চড়াও হয়। আর এর মূল্য দিতে হয়, উকিলকে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো পাতা আছে কি না, যাতে লিখা “খুনিদের বিচার করা যাবে না”! সেটাও আমাদের দেশেই সম্ভব। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা পুলিশের  ভূমিকা যেমন বলে শেষ করা যাবে না; ঠিক তেমনি আইন, আদালত, বিচারব্যবস্থা, বিচার পদ্ধতি ও আইনের শাসন নিশ্চিতকল্পে আইনজীবীদের ভূমিকা অপরিসীম। আইনজীবীদের অনুপস্থিত বিচারবিভাগ মৃত সন্তানের ন্যায়। বিচারক ও আইনজীবী বিচার ব্যবস্থায় একে অপরের পরিপূরক। বিচারকদের জন্য রয়েছে সুরক্ষা আইন। বিচারিক সিদ্ধান্তের জন্য কোনো বিচারপতিকে দায়ী করা যায় না। অথচ বিচারিক ও সামাজিক কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত আইনজীবীর হাতে পরছে হাতকড়া।

আইনজীবীরা বিভিন্ন হামলা মামলা অত্যাচার নির্যাতন গুম খুনের শিকার হলেও আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল আইনজীবীদের রক্ষায় বা ভিকটিম আইনজীবীদের জন্য কিছুই করেন না। এমন কি আইনজীবীদের উপর এই সব হামলা অত্যাচারের কোন খতিয়ান বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নিকট নেই বা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল করে না। এভাবে চলতে থাকলে আইন জগতে কালো অধ্যায় রচিত হবে। তাই আইন প্রণয়ণে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখতে হবে।

লেখক,
কলামিস্ট ও মানবাধিকার এক্টিভিস্ট।
ইমেইল: toharafat1998@gmail.com

এই সংবাদ টি সবার সাথে শেয়ার করুন




দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।  © All rights reserved © 2018 dainikinternational.com
Design & Developed BY Anamul Rasel