এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:
না-দাবী দলিল বা মুক্তিপত্র দলিল বা নো ক্লেইম ডিড জমির রেকর্ডে ভুল সংশোধনে এক কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে। শুধু তাই নয় জমির মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে, জমির রেকর্ড সংশোধন করতে, ক্রেতার সুরক্ষা, দখল ও জমি ব্যবহারের নিশ্চয়তা প্রদানে এ দলিলটি হতে পারে এক অপূর্ব নিদর্শণ। দলিলটির আইনগত অবস্থান, ব্যবহার ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে আজকের এ নিবন্ধ।
না-দাবি দলিল এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো সম্পত্তির ওপর কোনো প্রকার দাবি-দাওয়া না থাকার ঘোষণা যা ভবিষ্যতে মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে সাহায্য করে। বিশেষ করে জরিপের ভুলে বা অন্য কোনো কারণে ভুল রেকর্ডে নাম উঠলে প্রকৃত মালিকের পক্ষে না-দাবী দলিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যদিও এটি সরাসরি স্বত্ব হস্তান্তর করে না বরং বিদ্যমান স্বত্বকে বৈধতা দেয়। এর মাধ্যমে ভুলবশত অন্য কারো নামে থাকা সম্পত্তির ওপর আসল মালিকের দাবি প্রতিষ্ঠা পায় এবং রেকর্ড সংশোধনে এটি সহায়তা করে।
আরো সহজ করে বলতে গেলে, এই দলিল মূলত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে বিদ্যমান কোনো বিরোধ নিষ্পত্তি, ভুল বোঝাবুঝি দূরীকরণ অথবা কোনো সম্পত্তির উপর একাধিক ব্যক্তির সম্ভাব্য দাবি দূর করার জন্য ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো সম্পত্তির সহ-মালিকদের মধ্যে একজন তার অংশ অন্য সহ-মালিকের অনুকূলে ছেড়ে দিতে চান কিংবা কোনো ব্যক্তি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির উপর তার দাবি পরিত্যাগ করতে চান, সেক্ষেত্রে এই দলিল করে থাকেন।
পারিবারিক বা অংশীদারিত্বমূলক সম্পত্তির বণ্টন নিশ্চিত করতে, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতে, সম্পত্তির ভোগদখলকারীর সুরক্ষায় এবং মালিকানা হস্তান্তর ছাড়াই দখল ও ব্যবহার সংক্রান্ত নিশ্চয়তা প্রদান করতে না-দাবী দলিল একটি কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
এ দলিলের আইনগত মূল্যও যথেষ্ট। আমাদের সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী এই দলিল এডমিশন হিসেবে গ্রহণযোগ্য, রেজিস্ট্রেশন এ্যাক্ট অনুযায়ী রয়েছে সাক্ষ্যগত মূল্য, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন অনুযায়ী এটি একটি ঘোষণামূলক দলিলও বটে। একটি বিষয় লক্ষ্যনীয় যে, না-দাবী দলিল একটি প্রতিশ্রুতি দলিল হলেও এটা কিন্তু মালিকানা হস্তান্তরের দলিল নয়। না-দাবী দলিল দিয়ে নামজারি করা যায় না, কারণ না-দাবী দলিল মানে হলো আপনি কোনো সম্পত্তির উপর আপনার স্বত্বাধিকার ত্যাগ করছেন বা কোনো স্বত্ব দাবি করছেন না, বরং অন্য কারো স্বত্বকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন।
নামজারির জন্য প্রয়োজন মালিকানা হস্তান্তরের দলিল (যেমন-ক্রয় দলিল, হেবা দলিল বা ওয়ারিশান সূত্রে পাওয়া দলিল, বন্টননামা দলিল ইত্যাদি।) যেখানে আপনার নাম মালিক হিসেবে আসবে। কিন্তু না-দাবী দলিলের উদ্দেশ্য এর ঠিক বিপরীত।
না-দাবী দলিল রেজিস্ট্রি করতে রেজিষ্ট্রেশন ফি বাবদ দলিলে লিখিত মোট মূল্যের ১% টাকা, স্ট্যাম্প শুল্ক বাবদ ১০০-৩০০ টাকা ও স্থানীয় সরকার কর বাবদ ২-৩% টাকা প্রযোজ্য।
লেখকঃ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইনগবেষক। ইমেইলঃseraj.pramanik@gmail.com
https://youtu.be/5n_KNqUL-vk