ঢাকা[bangla_day], [english_date]
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মায়ের সম্পত্তিতে হিন্দু ও মুসলিম আইনে কে, কতটুকু পাবে?

admin
March 11, 2026 4:00 pm
শেয়ার:
Link Copied!

এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:

বাংলাদেশে মুসলিম এবং হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ভিন্ন হওয়ার কারণে সম্পত্তির বণ্টনও ভিন্ন হয়। বাংলাদেশে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলো মূলত ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে পুত্র ও কন্যার অধিকার নিয়ে সমাজে নানা ধরনের অস্পষ্টতা রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের পর কিছু ক্ষেত্রে হিসাবের মারপ্যাঁচ সাধারণ মানুষের কাছে জটিল মনে হতে পারে।

মুসলিম আইন অনুযায়ী, মা মারা গেলে তাঁর সম্পত্তি বণ্টন হয় ‘ফারায়েজ’ নীতি অনুযায়ী। এখানে পুত্র ও কন্যা উভয়েই উত্তরাধিকারী হন। মূল নীতিটি হলো: “একজন পুরুষ দুই নারীর অংশের সমান অংশ পাবে।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১)। অর্থাৎ, মা মারা গেলে পুত্র যে পরিমাণ সম্পত্তি পাবে, কন্যা তার অর্ধেক পাবে। যদি একজন পুত্র এবং একজন কন্যা থাকে, তবে সম্পত্তি ৩ ভাগে ভাগ হবে। পুত্র পাবে ২ ভাগ এবং কন্যা পাবে ১ ভাগ।

বাংলাদেশের হিন্দুরা দায়ভাগা পদ্ধতি অনুসরণ করে। হিন্দু আইনে সম্পত্তি মূলত দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত:

১. পিতৃপুরুষের সম্পত্তিঃ পিতা, পিতামহ প্রভৃতি থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তি।
২. স্ব-অর্জিত সম্পত্তিঃ ব্যক্তি নিজে যা অর্জন করেছেন।

মায়ের সম্পত্তি সাধারণত তার স্ত্রীধন নামে পরিচিত। এর মধ্যে পড়ে বিবাহকালে উপহার পাওয়া গহনা, বস্ত্র, আত্মীয়দের কাছ থেকে পাওয়া উপহার এবং মায়ের নিজের অর্জিত সম্পত্তি। স্ত্রীধনের উত্তরাধিকার নির্ভর করে তা বিবাহিত অবস্থায় অর্জিত নাকি অবিবাহিত অবস্থায় অর্জিত এবং তা কোন উৎস থেকে এসেছে তার উপর। সাধারণত, একজন নিঃসন্তান বিধবা নারীর স্ত্রীধন তার স্বামীর উত্তরাধিকারীদের কাছে যায় না, বরং তার নিজের পিত্রালয়ের দিকে যায়।

মা মারা গেলে তার স্ত্রীধনে কন্যার অগ্রাধিকার রয়েছে। কিছু ব্যাখ্যা অনুসারে, অলংকার, পোশাক-আশাক ইত্যাদি মূলত কন্যাদেরই প্রাপ্য বলে গণ্য করা হতো। পুত্র এবং কন্যা উভয়েই স্ত্রীধনের উত্তরাধিকারী, তবে ক্রম ও অংশের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।
মা মারা গেলে তার স্ত্রীধন নিম্নলিখিত ক্রমানুসারে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হয় :

অবিবাহিত কন্যা
বিবাহিত কন্যা (যে অভাবে আছে)
বিবাহিত কন্যা (যে স্বচ্ছল)
কন্যার কন্যা (নাতনি)
কন্যার পুত্র (নাতি)
পুত্র
পৌত্র
এই ক্রম থেকে বোঝা যায়, স্ত্রীধনের ক্ষেত্রে কন্যারা পুত্রের চেয়ে অগ্রাধিকার পায়। অর্থাৎ, কোনো পুত্র সন্তান থাকলেও প্রথমে কন্যাই স্ত্রীধন পাওয়ার অধিকারী।
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০২২ সালের ডিসেম্বরে শিশুভার ধালী বনাম চিত্ত রঞ্জন ম-ল মামলায় একটি যুগান্তকারী রায় দেন। এই রায়ে বলা হয়: দায়ভাগা আইনের আওতায় পুত্র ও কন্যা উভয়েই তাদের মায়ের স্ত্রীধনে সমান ও পরিপূর্ণ অধিকার রাখে। মায়ের স্ত্রীধন তার মৃত্যুর পরে কন্যা ও কন্যার কন্যা (নাতনি) আইনতভাবে পাবে । এই রায়ের মাধ্যমে নারীদের স্ত্রীধনে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
মা যদি তার স্বামীর (সন্তানদের পিতা) কাছ থেকে পিতৃপুরুষের সম্পত্তির একটি অংশ (উত্তরাধিকার সূত্রে) পান, তাহলে সেই সম্পত্তির প্রকৃতি পরিবর্তিত হয় না। এটি এখনও পিতৃপুরুষের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে। মা মারা গেলে এই সম্পত্তি তার পুত্রদের কাছে যাবে এবং কন্যারা সাধারণত এই অংশ থেকে বাদ পড়বেন।

বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে মুসলিম উত্তরাধিকার বিষয়ে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

স্বত্ব দখল বনাম নামজারি মামলায় আদালত বলেছেন, শুধুমাত্র খতিয়ানে নাম না থাকলেই কোনো সন্তান উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। মায়ের মৃত্যুর সাথে সাথে উত্তরাধিকার অনুযায়ী সম্পত্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সন্তানদের ওপর বর্তায়।

১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ ধারা ৪ অনুযায়ী, যদি মায়ের আগে কোনো পুত্র বা কন্যা মারা যায়, তবে ওই মৃত সন্তানের ছেলেমেয়েরা (মায়ের নাতি-নাতনি) তাদের বাবা বা মায়ের প্রাপ্য অংশ পাবে। এটি উচ্চ আদালত কর্তৃক স্বীকৃত।

যদি কোনো ভাই তার বোনকে মায়ের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে, তবে বোন দেওয়ানি আদালতে ‘পার্টিশন স্যুট’ বটোয়ারা মামলা দায়ের করে তার হিস্যা বুঝে নিতে পারেন।

লেখকঃ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। Email: seraj.pramanik@gmail.com, মোবাইলঃ ০১৭১৬৮৫৬৭২৮

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।