ঢাকা[bangla_day], [english_date]
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আদালত নাকি একান্নবর্তী সংসার: কুষ্টিয়া ৩য় যুগ্ম জেলা জজের অন্দরমহল!

admin
July 7, 2026 5:06 pm
শেয়ার:
Link Copied!

 

এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:
কুষ্টিয়ার যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালতে এখন বইছে এক অন্যরকম হাওয়া। আইন আর নিয়মের চিরচেনা কাঠখোট্টা আবহের মাঝে সেখানে নাকি এক অভিনব ‘সংসার-আদালত’ গড়ে উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের মাঝে কানাঘুষো কম নয়। আদালত মানেই গম্ভীর পরিবেশ, কালো গাউনের খসখসানি, আর আইনের ধারার চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু এ আদালতে প্রবেশ করলে আপনার মনে হতেই পারে আপনি কোনো এজলাসে নন, বরং একান্নবর্তী কোনো সনাতন (হিন্দু) পরিবারের অন্দরমহলে এসে পড়েছেন! যেখানে আইনের শাসনের চেয়ে ‘পারিবারিক অনুশাসন’ এবং অদ্ভুত সব চরিত্রের মহিমাই বেশি দৃশ্যমান।

১. ‘সোনায় সোহাগা’ বদলি ও পারিবারিক বিচার ব্যবস্থা
কথায় আছে, “স্বামী-স্ত্রী যেখানে, স্বর্গ নাকি সেখানে।” কুষ্টিয়ার বিচার বিভাগে বর্তমানে এমনই এক স্বর্গীয় আবহ বিরাজমান। বিজ্ঞ বিচারক সোনালী রানী উপাধ্যায় পূর্বে কুষ্টিয়ার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। প্রমোশন পাওয়ার পর সাধারণত দূর-দূরান্তে বদলি হওয়ার নিয়ম থাকলেও, তাঁর ক্ষেত্রে কুষ্টিয়া শহর যেন এক চুম্বক! প্রমোশন পেয়েও তিনি রয়ে গেলেন কুষ্টিয়াতেই যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালতের বিচারক হিসেবে।

উপড়াও পাওনা হিসেবে তাঁর স্বামী নিশিত রঞ্জন মহাশয়ও কুষ্টিয়ার সিনিয়র সিভিল জজ (সদর কোর্ট)। দুই জজ যখন এক শহরে, তাও আবার একই আঙিনায় তখন বিচারপ্রার্থীরা আইনের সুশাসনের চেয়ে ‘পারিবারিক আবহের’ সুবাসই বেশি পাচ্ছেন।

২. এজলাস নাকি দিবাযত্ন কেন্দ্র?
আদালতের খাস কামরা বা এজলাস অত্যন্ত পবিত্র ও স্পর্শকাতর জায়গা। কিন্তু ৩য় আদালতের চিত্রটি বেশ চমৎকার। বিচারকের একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান রয়েছে। সন্তানটি ঈশ্বরের আশীর্বাদ, কিন্তু বিধি বাম! এজলাস চলাকালীন মাঝেমধ্যেই সেই শিশুটি খাস কামরা থেকে দৌড়ে সরাসরি বিচারকের আসনে (এজলাসে) উঠে পড়ে, চিৎকার দেয়।

বিচারিক কার্য পরিচালনাকালে যেখানে পিনপতন নীরবতা কাম্য, সেখানে বিচারক মহোদয়কে একই সাথে সামলাতে হচ্ছে আইনের হাতুড়ি আর সন্তানের চঞ্চলতা। এই ‘মাল্টিটাস্কিং’ করতে গিয়ে বিজ্ঞ বিচারক মাঝেমধ্যে খেই হারিয়ে ফেলছেন এবং এর ঝাল গিয়ে পড়ছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আইনজীবীদের ওপর। আইনজীবীরাও হতবাক। তাারা কি আইনের সওয়াল-জবাব করতে এসেছেন, নাকি কোনো পারিবারিক নাট্যের দর্শক হয়েছেন!

৩. অলৌকিক পিওন ও ‘সাসপেনশন’ তত্ত্ব
এই আদালতের সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্র পার্সোনাল পিওন গোপাল বিশ্বাস। আইনের মারপ্যাঁচে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় শুনলে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কিন্তু খোদ আদালতের কর্মচারী যখন আইনের ঊর্ধ্বে চলে যান, তখন তাকে মিরাকলই বলতে হয়। মহাশয় পূর্বে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ধারায় (শিশু অপহরণ) মামলার আসামি ছিলেন। কিছুদিন আগে মাদকসহ পুলিশের হাতে ধরা খেয়ে রীতিমতো হাজতবাসও করে এসেছেন। চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, ফৌজদারি মামলায় হাজতবাস করলে তাৎক্ষণিক সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার অমোঘ নিয়ম। কিন্তু ৩য় আদালতের হাওয়া এতোই চড়া যে, কোনো এক অদৃশ্য মন্ত্রবলে তিনি বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাচ্ছেন! অবশ্য তাঁর মূল যোগ্যতা এখন আইনের সেবা নয়, বরং এজলাস চলাকালীন বিচারকের সন্তানকে খাস কামরায় আগলে রাখা।

৪. ‘কচ্ছপ গতি’র টাইপ ও ‘ঝুটিধারী’ গোষ্ঠ বাবু
বিচারকের ঠিক ডান পাশে বসেন জ্যোতি বিশ্বাস, আরেকজন হিন্দু নারী। চরম অদক্ষ কম্পিউটার অপারেটর। একজন সাক্ষীর মাত্র ৫ লাইনের জবানবন্দি টাইপ করতে তিনি সময় নেন পুরো ৩০ মিনিট! তাঁর এই ধীরস্থির টাইপিং দেখে মনে হতেই পারে, তিনি বুঝি জবানবন্দি নয়, মহাকাব্য রচনা করছেন।

এর ঠিক পেছনেই দেখা মিলবে আরেক হিন্দু ‘গোষ্ঠ বাবু’র। মাথায় চমৎকার ঝুটি বাঁধা। এমএলএসএস পদ থেকে অনেক আগেই অবসর নিয়েছেন, কিন্তু আদালতের মায়া তিনি কাটাতে পারেননি। পেনশনের টাকা ঘরে বসে তোলার চেয়ে আদালতের বাতাসে শ্বাস নেওয়া তাঁর পছন্দ। তবে এই ‘নিঃস্বার্থ’ সেবার পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত বাণিজ্য। সাক্ষী মহাশয়রা সাক্ষ্য দেওয়ার পর জবানবন্দির নিচে যে দস্তখত বা স্বাক্ষর করবেন, সেই স্বাক্ষর করার অনুমতি মিলবে কেবল তখনই, যখন গোষ্ঠ বাবুর পকেটে ‘দক্ষিণা’ পৌঁছাবে। দক্ষিণা না দিলে সাক্ষীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এ যেন এক আধুনিক ‘মগের মুল্লুক’!

মুক্তি কোথায়?
কুষ্টিয়ার ৩য় আদালত কক্ষে প্রবেশ করলে আইনি আবহাওয়ার চেয়ে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও ‘ইসকনী’ ভাবাবেগ বেশি ফুটে ওঠে বলে সাধারণ বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের গুঞ্জন। যেখানে আদালত হবে নিরপেক্ষ, ধর্মনিরপেক্ষ এবং নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ, সেখানে এক বিশেষ সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীরা আজ কোণঠাসা।

বিচার ব্যবস্থার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে এবং এই ‘সংসার-আদালত’ থেকে মুক্তি পেতে এখন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও হস্তক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন। আইন যেন তার নিজস্ব গতিতে চলে, কোনো পারিবারিক বা গোষ্ঠীগত গতিতে নয়!

লেখকঃ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’। মোবাইলঃ ০১৭১৬৮৫৬৭২৮। ইমেইলঃ seraj.pramanik@gmail.com

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।