ঢাকা[bangla_day], [english_date]
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শুধু ‘আপত্তিকর অবস্থায় দেখা’ কি পরকীয়া প্রমাণ করে? আদালতের ভাষায় ‘না’

admin
September 11, 2026 10:42 pm
শেয়ার:
Link Copied!

এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকঃ
সমাজে প্রচলিত একটা ধারণা আছে—কাউকে কারও সঙ্গে ‘আপত্তিকর অবস্থায়’ একবার দেখা গেলেই যেন পরকীয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। আদালতের চোখে সন্দেহ, ক্ষোভ বা একটিমাত্র ঘটনার বর্ণনা—আর আইনি অর্থে প্রমাণিত সত্য—এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক।
সম্প্রতি পাটনা হাইকোর্ট এই বিষয়ে স্পষ্ট একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। বিচারপতি বিবেক চৌধুরী ও বিচারপতি রানা বিক্রম সিংয়ের একটি বেঞ্চ এক স্বামীর আপিল খারিজ করে বলেন, কাউকে স্রেফ ‘আপত্তিকর অবস্থায়’ দেখা গেছে বললেই তা হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫-এর অধীনে পরকীয়া প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। ওই মামলায় স্বামীর অভিযোগ ছিল, তিনি স্ত্রীকে তার ভগ্নিপতির সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখেছেন। আদালত এই যুক্তি খারিজ করে বলেন, ‘আপত্তিকর অবস্থা’ আর ‘যৌনসম্পর্ক’—এই দুটি শব্দের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ, একটি দৃশ্য বা মুহূর্তের বর্ণনা থেকে সরাসরি যৌনসম্পর্কের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
এই নীতি নতুন নয়। সুপ্রিম কোর্ট বহু আগেই দাসতানে বনাম দাসতানে (১৯৭৫) মামলায় স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, বিবাহ-সংক্রান্ত মামলা মূলত দেওয়ানি প্রকৃতির, তাই ফৌজদারি মামলার মতো ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ’ করার প্রয়োজন নেই। এখানে প্রয়োজন হয় ‘প্রোবাবিলিটির প্রাধান্য’ বা সম্ভাব্যতার নিরিখে সন্তুষ্ট হওয়া। তবে এর মানে এই নয় যে দুর্বল বা অস্পষ্ট বিবরণেই আদালত সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। সরাসরি প্রমাণ যেহেতু প্রায় পাওয়াই যায় না, তাই পারিপার্শ্বিক (সারকামস্ট্যানশিয়াল) প্রমাণই মূল ভরসা—কিন্তু সেই প্রমাণকে হতে হয় ধারাবাহিক, সুসংহত এবং যৌক্তিকভাবে একটি সিদ্ধান্তের দিকেই ইঙ্গিতকারী।
সাচিন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় বনাম নীলিমা চট্টোপাধ্যায় (১৯৬৯) মামলায়ও একই নীতি এসেছিল—বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বা নিছক সন্দেহ যথেষ্ট নয়; ঘটনাপ্রবাহকে হতে হয় এমন একটি অবিচ্ছিন্ন শৃঙ্খল, যা যুক্তির নিরিখে একটিমাত্র সিদ্ধান্তের দিকেই নিয়ে যায়। শুধু ‘সুযোগ’ ছিল—এটুকু বলাও যথেষ্ট নয়; পাশাপাশি ‘প্রবণতা’ বা ঘনিষ্ঠতার আলামতও থাকা দরকার। অর্থাৎ দুজন মানুষ কোনো একটি মুহূর্তে একসঙ্গে ছিলেন, এইটুকু তথ্যই যথেষ্ট নয়—তার সঙ্গে যুক্ত হতে হয় আরও সংহত প্রমাণ, যেমন ধারাবাহিক ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, স্বীকারোক্তি, বা আচরণগত পরিবর্তনের প্রমাণ।
কেরালা হাইকোর্ট সম্প্রতি জিনেশ সিআর বনাম অশ্বতী পিআর (২০২৫) মামলায়ও একই সুরে বলেছেন, পরকীয়া সাধারণত গোপনে ঘটে বলে প্রত্যক্ষ প্রমাণ বিরল; তাই পারিপার্শ্বিক প্রমাণও গ্রহণযোগ্য, তবে শর্ত থাকে যে সেই পরিস্থিতি যুক্তিসম্মতভাবে ওই একটিমাত্র সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। এখানেও মূল কথা একই—বিক্ষিপ্ত তথ্য নয়, প্রয়োজন সংহত ও পারস্পরিক সংগতিপূর্ণ প্রমাণের সমষ্টি।
তাহলে বাস্তবে আদালত কী ধরনের প্রমাণকে গুরুত্ব দেন? মোটা দাগে—ধারাবাহিক যোগাযোগের নথি (ফোন কল বা বার্তার রেকর্ড), হোটেল বা ভ্রমণসংক্রান্ত নথি, নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্য, আচরণগত পরিবর্তনের প্রমাণ, কিংবা প্রত্যক্ষ স্বীকারোক্তি। এককভাবে কোনো একটি ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং এসব প্রমাণের সামগ্রিক ও সংগতিপূর্ণ চিত্রই আদালতকে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
এই আইনি অবস্থানের একটি বাস্তব তাৎপর্যও আছে। ভিত্তিহীন বা অতিরঞ্জিত অভিযোগ শুধু মামলায় ব্যর্থই হয় না, বরং তা নিজেই মানসিক নিষ্ঠুরতার (mental cruelty) প্রমাণ হয়ে বিপরীত পক্ষের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে পারে। তাই দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েনে ক্ষোভ বা সন্দেহের বশে কোনো অভিযোগ আনার আগে বিষয়টিকে আবেগ দিয়ে নয়, বরং তথ্য-প্রমাণের মানদণ্ডে যাচাই করে নেওয়াই বিচক্ষণতার পরিচয়।
শেষ কথা হলো, প্রতিটি মামলার ফলাফল নির্ভর করে তার নিজস্ব ঘটনা ও উপস্থাপিত প্রমাণের ওপর। এই লেখাটি কোনো নির্দিষ্ট মামলার আইনি পরামর্শ নয়, বরং আদালতের সাধারণ প্রবণতা সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত সচেতনতামূলক পর্যালোচনা মাত্র। ব্যক্তিগত পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়।
তথ্যসূত্র: দাসতানে বনাম দাসতানে, AIR 1975 SC 1534; সাচিন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় বনাম নীলিমা চট্টোপাধ্যায় (১৯৬৯); জিনেশ সিআর বনাম অশ্বতী পিআর, 2025:KER:88717 (কেরালা হাইকোর্ট); পাটনা হাইকোর্টের ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পর্যবেক্ষণ (সূত্র: Bar and Bench)।
লেখকঃ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও পিএইচ.ডি-ইন-ল। মোবাইলঃ ০১৭১৬৮৫৬৭২৮

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।