এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকঃ
আমাদের দেশে ফৌজদারি মামলায় প্রায়ই শোনা যায়, “অমুক আসামি আদালতে জবানবন্দি দিয়ে সব স্বীকার করেছে, সেখানে আপনার নামও আছে।” এই কথা শুনে অনেকেই ধরে নেন, এখন আর রক্ষা নেই। আবার উল্টো দিকে কেউ কেউ ভাবেন, জবানবন্দি নেওয়ার সময় নিয়মে একটু ভুল হলেই পুরো মামলা ভেস্তে যাবে।
দুটো ধারণাই আংশিক সত্য, পুরোপুরি নয়। বিষয়টি পরিষ্কার করেছে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়।
কোনো আসামি যখন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নিজের অপরাধের কথা স্বেচ্ছায় স্বীকার করেন, তখন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা অনুযায়ী তা লিখে রাখা হয়। একেই বলা হয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি। নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া এই বক্তব্য মামলায় অত্যন্ত শক্তিশালী সাক্ষ্য হতে পারে, কারণ সাধারণত কেউ নিজের ক্ষতি করে মিথ্যা কথা বলে না।
কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, একজন আসামি যদি নিজের পাশাপাশি অন্যদের নামও বলেন, তাহলে সেই কথা অন্যদের বিরুদ্ধে কতটা কাজে লাগবে?
একজনের কথায় অন্যজনকে শাস্তি দেওয়া নিরাপদ নয়
ধরুন, একটি মামলায় তিনজন আসামি। তাদের একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বললেন, “আমরা তিনজন মিলে অপরাধটি করেছি।”
এখন শুধু এই এক বক্তব্যের ওপর ভর করে বাকি দুজনকে দোষী সাব্যস্ত করা আইনের চোখে নিরাপদ নয়। কারণ:
যিনি জবানবন্দি দিচ্ছেন, তিনি নিজের দায় কমাতে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাতে পারেন।
ব্যক্তিগত শত্রুতা বা চাপের কারণেও অন্যের নাম আসতে পারে।
যাদের নাম বলা হলো, তারা ওই বক্তব্যদাতাকে জেরা করার সুযোগ পান না।
এ কারণে আইন বলে, সহ-আসামির স্বীকারোক্তি অন্যদের বিরুদ্ধে আদালত “বিবেচনায় নিতে পারেন” মাত্র, কিন্তু এটি একা শক্ত প্রমাণ নয়। অন্যজনকে দোষী করতে হলে এর সঙ্গে মেলে এমন স্বাধীন সমর্থনসূচক সাক্ষ্য এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা থাকতে হবে।
আদালত খুঁজে দেখবেন, জবানবন্দির বাইরে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আর কী আছে। যেমন:
প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য: কেউ কি নিজ চোখে ঘটনা বা অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে দেখেছেন?
আলামত উদ্ধার: অভিযুক্তের কাছ থেকে বা তার দেখানো জায়গা থেকে কি অস্ত্র, মোবাইল ফোন, সিম কার্ড বা অন্য কিছু উদ্ধার হয়েছে?
ফোনালাপের তথ্য: ঘটনার সময় কার সঙ্গে কার যোগাযোগ হয়েছিল, মোবাইলের অবস্থান কোথায় ছিল?
আচরণ ও পরিস্থিতি: ঘটনার পর অভিযুক্তের পালিয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক আচরণ ইত্যাদি।
এসব সাক্ষ্য যদি জবানবন্দির কথাকে সমর্থন করে, তখনই তা অন্য আসামির বিরুদ্ধে গুরুত্ব পায়।
আলোচিত মামলায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছিল। আদালত লক্ষ্য করেন, ম্যাজিস্ট্রেট একজন আসামির জবানবন্দি যথাযথ নিয়মে লিপিবদ্ধ করেননি:
আসামিকে স্পষ্টভাবে আশ্বস্ত করা হয়নি যে জবানবন্দি না দিলেও তাকে আবার পুলিশ হেফাজতে পাঠানো হবে না;
নির্ধারিত ফরমের প্রয়োজনীয় ঘরগুলো ঠিকভাবে পূরণ করা হয়নি;
জবানবন্দি স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে মর্মে প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্রও দেওয়া হয়নি।
এগুলো নিঃসন্দেহে গুরুতর অনিয়ম। তবে আদালত বলেছেন, এ ধরনের পদ্ধতিগত ত্রুটি সব মামলায় আপনা আপনি মারাত্মক বা মামলা-বিনাশী হয়ে যায় না। নির্দিষ্ট মামলায় প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য যদি স্পষ্ট হয় এবং অন্যান্য সাক্ষ্যও তা সমর্থন করে, তাহলে শুধু লিপিবদ্ধ করার ত্রুটির কারণে পুরো মামলা ভেঙে পড়বে এমন নয়।
এই মামলায় আদালত হত্যাকাণ্ড প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, মরদেহ উদ্ধারের পরিস্থিতি, মোবাইল ফোন ও সিম কার্ড উদ্ধার এবং অন্যান্য সাক্ষ্য একসঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন। ফলে জবানবন্দির ত্রুটিকে একমাত্র নির্ধারক বিষয় হিসেবে ধরা হয়নি।
রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিশু আসামির দণ্ড। আদালত দেখেছেন, অপরাধের সময় সংশ্লিষ্ট আসামির বয়স কত ছিল এবং শিশুদের জন্য প্রযোজ্য আইনের বিধান কী বলে, তা বিবেচনা করা বাধ্যতামূলক। মামলা চলাকালীন শিশু আইন, ২০১৩ কার্যকর হওয়ায় চলমান মামলায় সেই আইনের প্রাসঙ্গিক বিধানও আদালত বিবেচনায় নিয়েছেন। শিশুর ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কের মতো দণ্ড দেওয়া যায় না; আইন তাদের জন্য আলাদা সুরক্ষা দিয়েছে।
এই নীতিগুলো এসেছে রাষ্ট্র ও অন্যান্য বনাম মো. সাহেব আলী ও অন্যান্য মামলায় (The State and others Vs. Md. Shaheb Ali and others, 16 SCOB [2022] HCD 45)। বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ ও বিচারপতি মুহাম্মদ মাহবুব উল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন (ডেথ রেফারেন্স) গ্রহণ না করে সংশ্লিষ্ট আসামিদের দণ্ড আইন অনুযায়ী সংশোধন করেন।
যদি আপনি অভিযুক্ত হন: সহ-আসামির জবানবন্দিতে আপনার নাম এসেছে বলেই আপনি দোষী প্রমাণিত হয়ে যাননি। আপনার আইনজীবীর মাধ্যমে দেখুন, ওই বক্তব্যের বাইরে আপনার বিরুদ্ধে স্বাধীন কোনো সাক্ষ্য আছে কি না।
যদি আপনি ভুক্তভোগী বা বাদী হন: শুধু একটি জবানবন্দির ওপর ভরসা করে বসে থাকবেন না। প্রত্যক্ষদর্শী, আলামত ও অন্যান্য প্রমাণ যেন তদন্তে ঠিকভাবে উঠে আসে, সেদিকে নজর রাখুন।
আইনজীবী ও তদন্তকারীদের জন্য: জবানবন্দির ত্রুটি দেখিয়েই মামলা জেতার আশা যেমন ঠিক নয়, তেমনি শুধু জবানবন্দির ওপর মামলা দাঁড় করানোও ঝুঁকিপূর্ণ। পুরো সাক্ষ্যের চিত্র মজবুত করাই আসল কাজ।
ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য: জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করার প্রতিটি ধাপ, সতর্কবাণী ও প্রত্যয়ন যথাযথভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। এতে ন্যায়বিচার সুরক্ষিত হয় এবং পরে অহেতুক প্রশ্ন ওঠে না।
শেষ কথা হলো, ফৌজদারি বিচারে “স্বীকারোক্তি আছে” বা “স্বীকারোক্তিতে ভুল আছে”, কোনোটিই একা শেষ কথা নয়। আদালত দেখেন জবানবন্দি কীভাবে নেওয়া হয়েছে, কার বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে, তার পক্ষে আর কী প্রমাণ আছে এবং অভিযুক্তের বয়স ও আইনি অধিকার কী। এই সচেতনতা থাকলে ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পান, আর নির্দোষ মানুষ অন্যায় শাস্তি থেকে রক্ষা পান।
লেখকঃ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। মোবাইলঃ ০১৭১৬৮৫৬৭২৮
এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
