
৮ ডিএলআর ৫২৫ | জেলা প্রশাসক, ঢাকা বনাম মো. আবুল হাসান ও অন্যান্য | প্রথম আপিল নং ৭১/২০২১
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকঃ
জমির খতিয়ানে সরকারের নাম উঠে গেলেই কি জমিটি সরকারের হয়ে যায়? সম্প্রতি ঢাকা ল রিপোর্টসে (ডিএলআর) প্রকাশিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি রায়ে এর উত্তর মিলেছে: না, শুধু খতিয়ানে নাম থাকাই মালিকানার প্রমাণ নয়।
প্রায় ১১৩ শতাংশ জমির মূল মালিক ছিলেন হলধর মণ্ডল। তাঁর মৃত্যুর পর ভাই বলহরি মণ্ডল জমিটি পান। ১৯৫৬ সালে তিনি রেজিস্ট্রি দলিলমূলে জমিটি মকবুল হোসেনের কাছে বিক্রি করেন। মকবুল হোসেন নামজারি করেন, খাজনা দেন এবং এসএ খতিয়ানেও তাঁর নাম ওঠে।
পরে এই জমির ৩০ শতাংশ সরকার অধিগ্রহণ করে। কিন্তু আরএস জরিপের সময় জেলা প্রশাসক, ঢাকার নামে ১ নম্বর খতিয়ানে জমি রেকর্ড হয়ে যায়। এর মধ্যে বাদীর কেনা প্রায় ৫ শতাংশ (০.০৪৯৫ একর) জমিও পড়ে যায়। বাদী স্বত্বের মামলা করেন এবং বিচারিক আদালত তাঁর পক্ষে রায় দেন। সরকার হাইকোর্টে আপিল করে।
সরকারের পক্ষে সাক্ষ্য দেন একজন কানুনগো। তিনি স্বীকার করেন, মাত্র ৩০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ হয়েছিল। বাকি ৮৩ শতাংশ সরকারি জমি কি না, তা তিনি বলতে পারেননি।
সবচেয়ে বড় কথা, বাদীর নির্দিষ্ট জমিটি যে অধিগ্রহণের আওতায় পড়েছিল, সরকার তার কোনো কাগজ দেখাতে পারেনি। রোয়েদাদ তালিকা, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার রেকর্ড কিংবা অধিগ্রহণের মূল নথি আদালতে দাখিল করা হয়নি।
আদালতের দৃষ্টিতে “কিছু জমি অধিগ্রহণ হয়েছে” আর “এই জমিটিও অধিগ্রহণ হয়েছে” এক কথা নয়।
বাদী শুধু একটি কাগজের ওপর নির্ভর করেননি। তিনি দেখিয়েছেন:
ক) মূল মালিক থেকে ধারাবাহিক রেজিস্ট্রি দলিল
খ) নিজের ও পূর্বমালিকের নামে নামজারি
গ) নিয়মিত খাজনা পরিশোধ
ঘ) রাজউকের অনুমোদন নিয়ে ছয়তলা ভবন নির্মাণ
ঙ) পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ
চ) ঢাকা সিটি জরিপে (ডিপি খতিয়ান) নিজের নাম
সব প্রমাণ মিলিয়ে আদালত বাদীর দাবিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন।
হাইকোর্ট বলেছেন, আরএস খতিয়ান নিজে কাউকে মালিকানা দেয় না, আবার কারো মালিকানা কেড়েও নেয় না। অধিগ্রহণের কাগজপত্র না থাকলে শুধু সরকারি খতিয়ানে নাম থাকলেই জমি সরকারের বলে প্রমাণ হয় না। তাই বিরোধীয় জমির ক্ষেত্রে সরকারের নামে করা রেকর্ড ভুল এবং তা বাদীর ওপর প্রযোজ্য নয়।
বিচারিক আদালত প্রার্থনার বাইরে প্রতিকার দিয়েছেন, সরকারের এমন আপত্তিও হাইকোর্ট গ্রহণ করেননি। শেষ পর্যন্ত আপিল খারিজ হয় এবং বিচারিক আদালতের রায় বহাল থাকে।
এই রায়ের মানে এই নয় যে খতিয়ানের কোনো দাম নেই। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৪ক ধারা অনুযায়ী খতিয়ানের লেখা সঠিক বলেই ধরা হয়, যতক্ষণ না উল্টো প্রমাণ হাজির হয়। আবার “খতিয়ান যার, জমি তার”, এই ধারণাও ঠিক নয়। খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ, কিন্তু শেষ কথা নয়।
আপনার জমি ভুল করে সরকারের নামে রেকর্ড হয়ে গেলে হতাশ হবেন না। দলিল, নামজারি, খাজনার রসিদ ও দখলের প্রমাণ গুছিয়ে রাখুন। মামলায় জানতে চান, সরকার কোন অধিগ্রহণ মামলায় জমি নিয়েছে, রোয়েদাদ তালিকা ও ক্ষতিপূরণের রেকর্ড কোথায়, আর আপনার দাগের ঠিক কোন অংশ অধিগ্রহণ হয়েছে।
খতিয়ানে নাম আর আইনগত মালিকানা এক জিনিস নয়। সরকার অধিগ্রহণের দাবি করলে, নির্দিষ্ট জমিটি যে অধিগ্রহণ হয়েছে তা কাগজে-কলমে প্রমাণ করতে হবে।
লেখকঃ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। মোবাইলঃ ০১৭১৬৮৫৬৭২৮
এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
