ঢাকা[bangla_day], [english_date]
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জামিনের পরও বারবার “শ্যোন অ্যারেস্ট”: আইন কী বলে, উচ্চ আদালত কী বলেছে

admin
October 1, 2026 12:16 pm
শেয়ার:
Link Copied!

এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকঃ
আদালত জামিন দিলেন, কিন্তু কারাগারের ফটক খুলল না। কারণ, আরেকটি মামলায় তাঁকে “গ্রেপ্তার দেখানো” হয়েছে। সেই মামলায় জামিন মিলল, আবার নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো। এটা কি আইনসম্মত? দেশের উচ্চ আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিয়েছে।
একজন ব্যক্তি একটি মামলায় আদালত থেকে জামিন পেলেন। জামিনের সব শর্ত পূরণ করে তিনি মুক্তির অপেক্ষায়। ঠিক তখনই জানা গেল, তাঁকে অন্য একটি মামলায় আগেই গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। সেই মামলায় জামিন নেওয়ার পর আবারও আরেকটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো।
ফলাফল দাঁড়াল এই যে, আদালতের দেওয়া জামিনের আদেশ কাগজে রইল, কিন্তু বাস্তবে তার কোনো ফল রইল না। প্রচলিত ভাষায় একেই বলা হয় “শ্যোন অ্যারেস্ট” বা গ্রেপ্তার দেখানো।
আইনের দৃষ্টিতে মূল প্রশ্ন শুধু এটা নয় যে “আরেকটি মামলা আছে কি না”। আসল প্রশ্ন হলো, পুরো প্রক্রিয়াটি কি আইনসম্মতভাবে চলছে, নাকি আদালতের প্রক্রিয়াকেই এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে যাতে জামিনের আদেশ কখনো কার্যকর হতে না পারে।
যদি দেখা যায়, একের পর এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের জামিন আদেশকে কার্যত অকার্যকর করে দেওয়া হচ্ছে, এবং পরিস্থিতি আদালতের প্রক্রিয়ার অপব্যবহার বা হয়রানির পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাহলে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ক ধারায় তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা প্রয়োগ করে ন্যায়বিচারের স্বার্থে কার্যকর নির্দেশ দিতে পারেন।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ৫৬১ক ধারার ক্ষমতা কেবল কোনো মামলা বাতিল করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আদালতের কোনো আদেশ কার্যকর করা, আদালতের প্রক্রিয়ার অপব্যবহার ঠেকানো এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও এই ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত।
আলোচিত মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ লক্ষ করেন যে, একাধিক মামলায় পরপর গ্রেপ্তার দেখানোর কারণে আগের জামিন আদেশ কার্যকর হতে দেওয়া হচ্ছিল না। পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদালত ৫৬১ক ধারার অধীনে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেন, একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত:
পরবর্তী কোনো মামলায় ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন গ্রহণ না করতে, এবং কারা হেফাজত থেকে তাঁকে পুলিশ রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ না দিতে।
এই নির্দেশের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট যে, নতুন কোনো মামলা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেন তা জেনে উপযুক্ত আদালতে নিজে থেকে আত্মসমর্পণ করার সুযোগ পান।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ ধারা অনুযায়ী আসামিকে পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর ক্ষমতা ম্যাজিস্ট্রেটের আছে, কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগের আগে আইনের নির্ধারিত পূর্বশর্ত পূরণ হতে হবে। শর্ত পূরণ না হলে ম্যাজিস্ট্রেট কারা হেফাজতে রাখার আদেশও দিতে পারেন না; পুলিশ হেফাজতের প্রশ্ন তো আরও পরের কথা।
রায়ে আদালত আরও উল্লেখ করেন, কারা হেফাজতে থাকা কোনো ব্যক্তিকে পরে রিমান্ডে নেওয়ার ক্ষেত্রে ১৬৭ ধারার আইনি কাঠামো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এই রায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ এখতিয়ারগত বিষয়ও পরিষ্কার হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর অধীন মামলায় জামিন দেওয়ার এখতিয়ার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের নেই। আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালই মামলা আমলে নেবে এবং জামিনের আবেদন বিবেচনা করবে। সে কারণে আদালত মামলার নথি ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং অভিযুক্তকে সেখানে জামিন চাওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু “জামিন হয়েছে কি না” দেখলেই চলবে না। একসঙ্গে যাচাই করতে হবে:
ক) কোন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে
খ) কখন গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে
গ) সংশ্লিষ্ট আদালতের এখতিয়ার আছে কি না
ঘ) ১৬৭ ধারার শর্তগুলো পূরণ হয়েছে কি না
ঙ) আগের জামিন আদেশ বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না
চ) পুরো প্রক্রিয়াটি আইনসম্মত কি না
এসব তথ্য ও নথি একসঙ্গে পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়, বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়া নাকি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার।
এই নীতির গুরুত্বপূর্ণ নজির: মো. নুরুল ইসলাম বাবুল বনাম রাষ্ট্র, ফৌজদারি বিবিধ মামলা নং ২২৫৯/২০০৪, রায় প্রদানের তারিখ ৪ এপ্রিল ২০০৪, প্রকাশিত: LEX/BDHC/0089/2004 (BLD)।
জামিনের আদেশ শুধু কাগজে লেখা থাকার জন্য নয়; তা বাস্তবে কার্যকর হওয়ার অধিকারও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ। এক মামলার জামিনকে অন্য মামলায় ধারাবাহিকভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে নিষ্ফল করা হলে, ঘটনা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় হাইকোর্ট বিভাগ তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা প্রয়োগ করে কার্যকর প্রতিকার দিতে পারেন।
লেখকঃ আইনজীবী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। মোবাইলঃ ০১৭১৬৮৫৬৭২৮

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।