
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকঃ
নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় দায়েরকৃত চেক ডিজঅনার মামলা আমাদের দেশের আদালতগুলোতে অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়। ব্যবসায়িক লেনদেন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ঋণ পরিশোধ পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে চেক ব্যবহৃত হয়, আর চেক ডিজঅনার হলেই অনেকে ধরে নেন যে আসামির সাজা প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। উচ্চ আদালতের একাধিক সিদ্ধান্তে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কেবল একটি ডিজঅনার হওয়া চেক থাকলেই কাউকে দণ্ডিত করা যায় না—আইনের নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হওয়া বাধ্যতামূলক। একটি সাম্প্রতিক রিভিশন আবেদনের প্রেক্ষাপটে আজ আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ঋণ বা অন্য কোনো দায় পরিশোধের উদ্দেশ্যে যে চেক ইস্যু করেন, তা যদি হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকার কারণে ব্যাংক কর্তৃক অপরিশোধিত হয়ে ফেরত আসে, তবে তা এই ধারায় একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে এই অপরাধ প্রমাণের জন্য আইনে কিছু আবশ্যিক পূর্বশর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পূরণ না হলে মামলা টিকতে পারে না।
১৩৮ ধারার প্রথম Proviso অনুযায়ী চেক ডিজঅনার হওয়ার পর ১৫ দিনের মধ্যে ড্রয়ারকে (চেক প্রদানকারীকে) লিখিতভাবে দাবি জানিয়ে নোটিশ পাঠাতে হয়, এবং নোটিশ প্রাপ্তির পর ৩০ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধের সুযোগ দিতে হয়। এটি অপরাধ গঠনের একটি বাধ্যতামূলক পূর্বশর্ত।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নোটিশ যথাযথভাবে জারি ও তামিল হয়েছে কিনা—এই প্রমাণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে বাদীর ওপর বর্তায়, আসামির ওপর নয়। ৬০ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৬৭৭-এ প্রদত্ত সিদ্ধান্তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, নোটিশ প্রদান ও তামিলের বিষয়টি প্রমাণ করার দায়িত্ব বাদীর, আর এতে ব্যর্থ হলে মামলাটি ১৩৮ ধারার আওতায় টিকতে পারে না। একইভাবে ৩৯ বিএলডি, পৃষ্ঠা ২২২-এ হাইকোর্ট বিভাগ পর্যবেক্ষণ করেছেন, নোটিশ যথাযথভাবে জারি হয়েছে কিনা তা নিয়ে সামান্যতম সংশয় থাকলে এবং আসামি ইচ্ছাকৃতভাবে নোটিশ গ্রহণে বিরত না থাকলে আসামি খালাস বা অব্যাহতি পাওয়ার যোগ্য।
অভিযোগকারীর আরজিতে লেনদেনের সুনির্দিষ্ট তারিখ, সময়, স্থান বা প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ না থাকলে অভিযোগটি অস্পষ্ট ও আইনত দুর্বল হয়ে পড়ে। ৬০ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৬৭৭-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এমন অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে বিচারের সম্মুখীন করা আইনসম্মত নয়। বিশেষ করে যেসব মামলায় বাদী ও আসামি পূর্বপরিচিত বা আত্মীয় এবং তাঁদের মধ্যে একাধিক দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা চলমান থাকে, সেক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে আদালতের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
তিন: হস্তাক্ষরের অসঙ্গতি ও ব্ল্যাংক চেক অপব্যবহার
চেকের তারিখ, টাকার অঙ্ক (কথায় ও অংকে) বা অন্যান্য বিবরণ যদি চেক প্রদানকারীর নিজের হাতের লেখা না হয়, তাহলে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন তৈরি করে। ৭৫ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৪৪৭ (এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র) মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ড্রয়ার নিজে চেক সম্পূর্ণরূপে পূরণ না করলে এবং হস্তাক্ষরে অসঙ্গতি থাকলে, বাদীকেই প্রমাণ করতে হবে যে ড্রয়ারের সুনির্দিষ্ট সম্মতিতে অন্য কেউ তা পূরণ করেছে।
আরও স্পষ্টভাবে, ৫৬ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৬৩৬ (এম.এ. মজিদ বনাম মোঃ আব্দুল মোতালেব) মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ ব্যাখ্যা করেছেন—স্বাক্ষর, টাকার অংক ও পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখায় থাকলে তা নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ৩(ই) ধারা অনুযায়ী বৈধ “issuance of cheque” হিসেবে গণ্য হয় না। আর আপিল বিভাগ ১৭ বিএলসি-তে (খন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান বনাম রাষ্ট্র) সুস্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, কেবল স্বাক্ষরযুক্ত ব্ল্যাংক চেক পাওয়া মানেই গ্রহীতাকে ইচ্ছামতো অঙ্ক বসিয়ে তা ব্যবহারের অধিকার দেয় না।
নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ৪৩ ধারা অনুযায়ী, আইনানুগ প্রতিদান ছাড়া কোনো দলিল হস্তগত হলে তা থেকে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয় না। ৩৮ বিএলডি, পৃষ্ঠা ৬১৬-৬২০ (লোকমান বনাম আয়ুব আলী ও রাষ্ট্র) মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ অভিমত দিয়েছেন, প্রকৃত কনসিডারেশন কী ছিল তা প্রমাণে বাদী ব্যর্থ হলে এবং ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে চেক ইস্যু করা হয়নি বলে প্রতীয়মান হলে আসামি খালাস বা অব্যাহতি পাওয়ার যোগ্য। কেবল চেক হাতে থাকলেই কেউ নিজেকে “Holder in Due Course” দাবি করতে পারেন না—এটি প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়।
ফৌজদারী কার্যবিধির ২৬৫(সি) ধারা অনুযায়ী চার্জ গঠনের আগে আসামি অব্যাহতির (Discharge) আবেদন করতে পারেন। এই আবেদন বিবেচনার সময় বিচারকের দায়িত্ব হলো নথিতে বিদ্যমান উপাদান পর্যালোচনা করে অভিযোগের প্রাথমিক (prima facie) ভিত্তি আছে কিনা তা নির্ধারণ করা। নোটিশ জারির ব্যর্থতা, আরজির অস্পষ্টতা, হস্তাক্ষরের অসঙ্গতি বা কনসিডারেশনের অনুপস্থিতির মতো বিষয়গুলো নথিতে স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও যদি আদালত তা বিবেচনায় না নিয়ে যান্ত্রিকভাবে আবেদন নামঞ্জুর করে, তবে তা আইনগত ভুল (error of law) হিসেবে গণ্য হয় এবং ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৩৯এ ধারামতে রিভিশনাল এখতিয়ারে তা হস্তক্ষেপযোগ্য।
চেক ডিজঅনার মামলায় বাদী ও আসামি—উভয় পক্ষের জন্যই এই আইনি নীতিগুলো জানা গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে প্রকৃত পাওনাদারদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই আইনের উদ্দেশ্য, অন্যদিকে ব্ল্যাংক চেকের অপব্যবহার, ব্যক্তিগত শত্রুতা বা হয়রানিমূলক মামলার মাধ্যমে নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফাঁসানোর ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই লিগ্যাল নোটিশ যথাযথভাবে জারি হয়েছে কিনা, চেকের হস্তাক্ষর প্রকৃতপক্ষে প্রদানকারীর কিনা, এবং প্রকৃত কনসিডারেশন ছিল কিনা—এই বিষয়গুলো প্রতিটি মামলায় নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখা উচিত।
লেখকঃ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইনগবেষক। মোবাইলঃ ০১৭১৬৮৫৬৭২৮
এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
